ঢাকা, মঙ্গলবার, ৫ই মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ২২শে বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

বিচারপতি নিয়োগ আইন প্রণয়ন করা বাস্তবতার নিরীখে অপরিহার্য

ঢাকা: সংবিধানের আলোকে বিচারপতি নিয়োগ সংক্রান্ত আইন প্রণয়ন করা বাস্তবতার নিরীখে অপরিহার্য বলে মন্তব্য করেছেন প্রধান বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেন।

বুধবার (১৫ ডিসেম্বর) বিচারিক কর্মজীবনের শেষ দিনে অ্যাটর্নি জেনারেল অফিস ও সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সংবর্ধনার জবাবে প্রধান বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেন এমন মন্তব্য করেন।

 

প্রধান বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেন অবসরে যাবেন আগামী ৩০ ডিসেম্বর। ওই সময়ে অবকাশকালীন ছুটি থাকায় বুধবার বিচারিক জীবনের শেষ কর্মদিবস বুধবার তাকে সংবর্ধনা দেওয়া হয়।

সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে আপিল বিভাগের বিচারপতি, হাইকোর্ট বিভাগের বিচারপতি এবং শত শত আইনজীবী উপস্থিত ছিলেন।

অ্যাটর্নি জেনারেল কার্যালয়ের পক্ষ থেকে অ্যাটর্নি জেনারেল এ এম আমিন উদ্দিন প্রধান বিচারপতির জীবনী পাঠ করে সংবর্ধনা দেন। এরপর সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির পক্ষ থেকে সহ-সভাপতি মুহাম্মদ শফিক উল্ল্যা সংবর্ধনা দেন।

 

সংবর্ধনার জবাবে প্রধান বিচারপতি বলেন, আমাদের সংবিধানে রাষ্ট্রের তিনটি অঙ্গ; আইন বিভাগ, শাসন বিভাগ ও বিচার বিভাগের দায়িত্ব এবং স্বাতন্ত্রিক বৈশিষ্ট্য স্পষ্টভাবে বিধৃত রয়েছে।

‘তিনটি অঙ্গের সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্কই গণতন্ত্রকে বিকশিত করে নিঃসন্দেহে বলা যায় যে,
‌‌‘ইটস ইজ বিউটি অব আওয়ার কনস্টিটিউশন’ একটি স্বাধীন বিচার ব্যবস্থার অন্তর্নিহিত শক্তির উৎস হলো জনগণের আস্থা। এটা হলো বিচারকদের সততা, সক্ষমতা ও নিরপেক্ষতার প্রতি গণমানুষের অবিচল বিশ্বাস। সাধারণ মানুষের এই আস্থা অর্জনের জন্য বিচারকদের একদিকে যেমন উঁচু নৈতিক মূল্যবোধ ও চরিত্রের অধিকারী হতে হবে, তেমনি অন্যদিকে সদা বিকাশমান ও পরিবর্তনশীল আইন, প্রযুক্তিগত উৎকর্ষ ও সামাজিক মূল্যবোধ বিষয়ে সচেতন থাকতে হবে। এটা অর্জন সম্ভব কেবলমাত্র নিয়মিত অধ্যয়ন, সময়মতো এবং আইনানুগভাবে বিচারিক কাজ সম্পন্নকরণের মাধ্যমে। ’

আইনজীবীদের উদ্দেশ্যে করে প্রধান বিচারপতি বলেন, আইন পেশার সুমহান মর্যাদা রক্ষা করতে সব অনিয়মের বিরুদ্ধে বার ও বেঞ্চকে সোচ্চার থাকতে হবে। আইনজীবী ও বিচারকরা হচ্ছে একটি পাখির দুটি পাখার মতো। বাম হাত ও ডান হাতের মতো। তাদের পরস্পরের প্রতি আস্থার সম্পর্ক বিচার ব্যবস্থার গুণগত মান বাড়বে।

বিচারকের সংখ্যা নিয়ে প্রধান বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেন বলেন, মামলার সংখ্যা বিবেচনায় আমাদের বিচারকের সংখ্যা অপ্রতুল। মামলার জট নিরসনে দেশের অধস্তন আদালত থেকে শুরু করে সর্বোচ্চ আদালত পর্যন্ত বিচারকের সংখ্যা পর্যায়ক্রমে দ্বিগুণ করা প্রয়োজন। জেনে খুশি হয়েছি যে, উচ্চ আদালতে বিচারপতি নিয়োগ সংক্রান্ত আইন প্রণয়নের লক্ষ্যে সরকার কাজ শুরু করেছে।

‘সংবিধানের আলোকে বিচারপতি নিয়োগ সংক্রান্ত আইন প্রণয়ন করা বাস্তবতার নিরীখে অপরিহার্য। এতে বিচারপতি নিয়োগের কাজটি আরো স্বচ্ছ ও দ্রুততর হবে এবং জনগণের মধ্যে বিচারপতি নিয়োগের স্বচ্ছতা সম্পর্কে ভিত্তিহীন ধারণা দূরীভূত হবে। ’

ভার্চ্যুয়াল কোর্টের মাধ্যমে বিচারকার্য পরিচালনার জন্য ফিজিক্যাল কোর্টের মতো তেমন অবকাঠামোগত সুযোগ-সুবিধার প্রয়োজন নেই। এক্ষেত্রে ফিজিক্যাল এবং ভার্চ্যুয়াল কোর্ট যুগোপতভাবে বিচারকার্য পরিচালনা করলে বিচার নিষ্পত্তি আরো দ্রুততর হবে বলে মন্তব্য করেন প্রধান বিচারপতি।

মামলার জট নিয়ে বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেন বলেন, মামলার জট হ্রাস ও মানুষের আস্থা ধরে রাখতে হলে বিচারকদের আরো কঠোর পরিশ্রম করতে হবে। বিচারপ্রার্থীদের প্রতি গভীর মমত্ববোধসহ বিচারকার্য পরিচালনার নিমিত্ত সব স্তরের বিচারকদের অনুরোধ জানান তিনি।

প্রধান বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেন অবসরে যাবেন চলতি বছরের ৩০ ডিসেম্বর। ওই দিন দেশের ২২তম প্রধান বিচারপতির বয়স ৬৭ বছর পূর্ণ হবে। সংবিধান অনুসারে বিচারপতি পদের মেয়াদ ৬৭ বছর পর্যন্ত।

১৯৫৪ সালের ৩১ ডিসেম্বর কুমিল্লায় জন্ম গ্রহণ করেন প্রধান বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেন। বাবা অ্যাডভোকেট সৈয়দ মোস্তফা আলী এবং মা বেগম কাওসার জাহান।

বিএসসি ও এলএলবি ডিগ্রি অর্জনের পর লন্ডন ইউনিভার্সিটিতে দুটি কোর্স সম্পন্ন করা বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেন ১৯৮৩ সালে হাইকোর্ট বিভাগের আইনজীবী হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হন। ১৯৯৯ সালে ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল হিসেবে নিয়োগ পান।

রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী থাকা অবস্থায় ২০০১ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি নিয়োগ পান অতিরিক্ত বিচারপতি হিসেবে। দুই বছর পর ২০০৩ সালে হাইকোর্টের স্থায়ী বিচারপতি হন। পরবর্তীতে ২০১১ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি আপিল বিভাগের বিচারপতি হিসেবে নিয়োগ পান তিনি। আপিল বিভাগের বিচারপতির দায়িত্বপালনকে ২০১৮ সালের ৩ ফেব্রুয়ারি দেশের ২২তম প্রধান বিচারপতি হিসেবে শপথ নেন। বঙ্গভবনে তাকে শপথবাক্য পাঠ করান রাষ্ট্রপতি মো.আবদুল হামিদ। ডিসেম্বরে অবসরে যাচ্ছেন প্রধান বিচারপতি।