মাত্র কয়েক দিনের ব্যবধানে ফাহিমা, লামিয়া ও সর্বশেষ রামিসার মতো নিষ্পাপ শিশুদের অপ্রত্যাশিত ও অনাকাঙ্ক্ষিত লোমহর্ষক করুন মৃত্যু সমগ্র জাতির বিবেককে নাড়িয়ে দিয়েছে। প্রত্যেকটি শিশুকেই পাশবিক নির্যাতনের পর নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়েছে। যাদেরকে ধর্ষণ ও হত্যা করা হয়েছে তারা প্রত্যেকেই অবুঝ, নাবালিকা এবং শত্রু ও অপরাধ দুটি সম্পর্কে তারা সম্পূর্ণরূপে অজ্ঞ ।অথচ ,তারা সেই শত্রু ও পৈশাচিক অপরাধের নির্মম শিকার। পক্ষান্তরে,যারা অপরাধী তারা প্রত্যেকেই প্রাপ্তবয়স্ক, বিবাহিত এবং কেউ কেউ সন্তানেরও জনক। তারা ভিকটিমের প্রতিবেশী বা পরিচিত জন,কেউ আবার আত্মীয় স্বজন। এইসব ঘটনা প্রমাণ করে যে বর্তমান ঘুণেধরা সমাজে স্ত্রী-সন্তানাদি নিয়ে বসবাসের চেয়ে বনজঙ্গলে বসবাস অধিকতর নিরাপদ। হিংস্র বাঘ,হায়েনা ও সিংহ কিংবা বিষধর সাপ বড়জোর আপনার প্রাণ কেড়ে নিবে কিন্তু ইহারা কখনোই আপনার স্ত্রী ও কন্যা সন্তানের সম্ভ্রম কেড়ে নিবে না,সতীত্বকে দুমরে মুচড়ে পিষিয়ে দিবে না। আইয়ামে জাহেলিয়াতের যুগে কন্যাশিশুকে জীবন্ত পুঁতে ফেলার নির্মমতা আমরা ইতিহাসে জেনেছি কিন্তু ইজ্জত লুণ্ঠনের পর হত্যার কথা শুনিনি যা এখন শুনতে হচ্ছে।
এখন প্রশ্ন হলো-এমন ঘৃণিত,বিকৃত ও অভিশপ্ত অপরাধীদের দ্রুত বিচার ও শাস্তি নিশ্চিত করতে রাষ্ট্র ও সরকার কতটুকু আন্তরিক,সক্ষম ও ইচ্ছুক?
জলজ্যান্ত যে সর্বশেষ ঘটনাটি দেশজুড়ে আলোচিত সেটি হলো-
ছোট্ট রামিসা… মাত্র দ্বিতীয় শ্রেণীর একটা শিশু।
রাজধানীর পল্লবীতে একটি বহুতল ভবনের প্রতিবেশীর ফ্ল্যাটেই অপেক্ষায় ছিলো তার যমদূত এক নরপিশাচ।
প্রতিদিন বড় বোনের সাথে স্কুলে যেতো রামিসা।
কিন্তু সেদিন সে আর স্কুলে যেতে পারেনি…
১২ মে, মঙ্গলবার সকালে মা দেখলেন
রামিসাকে কোথাও খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না।
পুরো বিল্ডিং খুঁজেও না পেয়ে হতাশ হয়ে নিজ বাসার
সামনে এসে দেখেন ঠিক সামনের ফ্ল্যাটের দরজার সামনে পরে আছে রামিসার একটা জুতো।
একজন মা তখনও বুঝতে পারেননি
তার জীবনের সবচেয়ে ভয়ংকর মুহূর্ত সামনে দাঁড়িয়ে আছে।
দরজায় বারবার নক করেও কোনো সাড়া পাওয়া গেল না।পরে পুলিশ এসে দরজা ভেঙে ভেতরে ঢুকে যে দৃশ্য দেখলো তা কোনো বাবা-মা যেন জীবনে কখনো না দেখে।খাটের নিচে পড়ে ছিল ছোট্ট রামিসার মস্তকবিহীন ক্ষতবিক্ষত খন্ডিত দেহ।আর তার বিচ্ছিন্ন মাথা পাওয়া গেল বাথরুমে পানির বালতিতে!
মাত্র ৭ বছর বয়সী একটি নিষ্পাপ নিরপরাধ শিশুর সাথে
এতটা নিষ্ঠুরতা কীভাবে সম্ভব? সবচেয়ে ভয়ংকর বিষয় হলো এই নৃশংসতায় সহযোগিতা করেছে ঘাতক সোহেলের স্ত্রী যে একজন নারী।আর সবচেয়ে হৃদয়বিদারক বিষয় হলো রামিসার বাবা বলেছেন,
“আমি আমার মেয়ের হত্যাকারীর বিচার চাই না…
কারণ আপনারা এর বিচার করতে পারবেন না। এসবের বিচার করার রেকর্ড আপনাদের নেই।
আমার মেয়েও তো আর ফিরে আসবে না…
কিছুদিন পর সবাই আমার মেয়ের কথা ভুলে যাবে…”।একজন বাবা কতটা ভেঙে পড়লে,কতটা অসহায় হলে নিজের মেয়ের হত্যার বিচার নিয়েও আশা হারিয়ে ফেলে
এই কথাগুলো সেটাই বলে দেয়।
এই ঘটনার সবচেয়ে ভয়ঙ্কর দিক হলো রামিসাকে ফ্ল্যাটে ডেকে নিয়ে যায় নরপিশাচের স্ত্রী যে নিজেও একজন নারী ও মা,ধর্ষণে স্বামীকে সাহায্য করে সে,লাশ টুকরো টুকরো করতে সাহায্য করে সে এবং সর্বশেষ পাষন্ড স্বামীকে পালিয়ে যেতেও সাহায্য করে সে। আপনাদের নিশ্চয়ই মনে আছে যে কলকাতায় মৌমিতাকে ধর্ষণেও সক্রিয় সহযোগিতা করেছিল তার নারী সহকর্মীরা ! অতএব, পাশের বাড়ির বা পাশের ফ্ল্যাটের ভাবীও হতে পারে আপনার কন্যা সন্তানের সর্বনাশের মূল।
আমরা এমন এক সমাজে বাস করছি
যেখানে ধর্ষণ, খুন, শিশু নির্যাতনের খবর
কিছুদিন আলোচনায় থাকে,
তারপর আরেকটা নতুন ঘটনার ভীড়ে
হারিয়ে যায়। আইন ও আদালত তার স্বভাবগত শ্লোথ গতিতেই চলে।কখনো কখনো আবার রহস্যময় কারণে মাঝপথে আচমকা থেমে যায় বিচারকের কলম। এক বা একাধিক দুষ্কৃতকারী কয়েক মূহুর্তে যে সর্বনাশ একজন মানুষের বিশেষ করে নারী ও অবুঝ শিশুর জীবনে করতে পারে,আমরা সভ্য সমাজের দাবিদারেরা বিদ্যা-বুদ্ধি-জ্ঞান-আইন দিয়ে যুগ পেরিয়েও সেই সর্বনাশের বিচার করতে পারি না।তাহলে কি ধর্ষক ও খুনীর মতো দুষ্কৃতকারীদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে সমাজ ও রাষ্ট্র এখনো যথেষ্ঠ সক্ষমতা অর্জন করতে পারেনি? তা নাহলে ২০০৯ সালে ১১জন নারীকে ধর্ষণ ও হত্যার দায়ে ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত আসামি রসু খাঁ’র ফাঁসি কেনো আজো কার্যকর করা যায়নি? চার বছরের ছোট্ট মেয়ে পূজার জননাঙ্গ ব্লেড দিয়ে কেটে ধর্ষণকারী ব্যক্তি কীভাবে জামিনে বের হয়ে আসে ? আছিয়ার ধর্ষক ও খুনীর বিচার কেনো আজো শেষ হয়নি? এসব প্রশ্নের সদুত্তর মিলবে না কারো কাছে। আমাদের আইন, আইনপ্রয়োগকারী, আদালত, সরকার ও রাষ্ট্র কি তবে অক্ষম,দুর্বল ও সীমাবদ্ধ ? প্রত্যেকটি নারকীয় হত্যাকাণ্ডের পরই আসামিদের কেউ কেউ অধরা থেকে যায়, কেউ কেউ ছাড়া পেয়ে যায়,কেউ কেউ খালাস হয়ে যায়,কেউ কেউ আবার ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত হয়েও দিব্যি বেঁচে থাকে বছরের পর বছর।
কিন্তু একটা বাবা-মায়ের জীবনে
এমন দগদগে রক্তাক্ত ক্ষত কখনো মুছে যায় না,প্রাণাধিক প্রিয় সন্তানের বিয়োগ ব্যথাও কমে না। একটা শূন্যতার হাহাকার তাদের বুকের ভিতর দাপাদাপি করে আজীবন। আমাদের দেশের রক্ষাকর্তারা প্রায় সব ঘটনার পরপরই ভিকটিমের পরিবারের পাশে দাঁড়িয়ে সান্ত্বনা দেয়, কিছু আর্থিক ক্ষতিপূরণ দেয়, অসহায় পরিবারের দায়িত্ব নেয়- এ যেনো দুর্বৃত্তকে শাস্তি দিতে না পারার ব্যর্থতার দায় শোধ করা।অথচ, অপরাধীকে উপযুক্ত কঠোর শাস্তি দিতে পারলে ভিক্টিমের পাশে দাঁড়ানোর প্রয়োজনই পড়ে না। কোনো বাবা-মা-ই তাদের অমূল্য সন্তানের জন্য আর্থিক ক্ষতিপূরণ চায় না,চায় দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি এবং সেই শাস্তি যেনো দ্রুততম সময়ে কার্যকর হয়।
বিগত এক মাসে পরপর কয়েকটি দুঃসংবাদ শোনার ও দেখার পর দুঃস্বপ্নের মধ্য দিয়েই যাচ্ছে আমার সারাটি ক্ষণ। এমন ভয়ঙ্কর ভাগ্য আমার কলিজার টুকরা মেয়েটির জন্য অপেক্ষা করছে না তো ? এমন একটা পৈশাচিক, বিভৎস ও ন্যক্কারজনক অপরাধ সংঘটিত করার জন্য ধীরে ধীরে বড় হচ্ছে না তো আমার আদরের ছেলেটি ?
তাই,একজন কন্যা শিশুর পিতা হিসাবে জগতের সব শিশুর ইজ্জত ও জীবনের নিরাপত্তা নিয়ে আমি আজ ভীষণভাবে শংকিত। একইভাবে একজন পুত্র সন্তানের পিতা হিসাবে এমন বন্য, হিংস্র ও পাশবিক নির্যাতন ও খুনের ঘটনায় আমি দারুনভাবে লজ্জিত।
লেখক-মোঃ আসাদুজ্জামান বাচ্চু
কবি,সংগঠক, সাংবাদিক ও কলামিস্ট।