ঢাকা, সোমবার, ২৫শে জানুয়ারি, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ, ১১ই মাঘ, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ

‘ওই মহামানব আসে…’

বাংলাদেশের বিজয়ের পর বঙ্গবন্ধুর পরিণতি নিয়ে সকলের মনে উৎকণ্ঠা ছিল। অনেকের ধারণা ছিল বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করা হবে। ইয়াহিয়া খান সেরকম আদেশও দিয়েছিলেন। পরে জানা যায় ‘মুজিবের জন্য কবরও খোঁড়া হয়েছিল’। কলকাতার দৈনিক ‘যুগান্তর’ পত্রিকার ১০ জানুয়ারির একটি সংবাদে লেখা হয়েছিল:

‘কারাগারে শেখ মুজিবের জন্য কবরও খোঁড়া হয়েছিল। কিন্তু জেলারের অনুকম্পার জন্য শেষ পর্যন্ত কবরস্থ হবার থেকে শেখ মুজিব রক্ষা পেয়ে যান। গত রাতে বঙ্গবন্ধুর একজন ঘনিষ্ঠ সহযোগী ঐ কথা বলে দীর্ঘশ্বাস ফেলেন, ‘নইলে যে কি হত তা কল্পনা করা যায় না।’
লন্ডনের হোটেলে তিনি বলেন, জেলার জানতে পেরেছিলেন যে, ইয়াহিয়া খাঁ আর প্রেসিডেন্ট থাকছেন না। সেই জন্য তিনি মুজিবকে নিজের বাড়ীতে নিয়ে গিয়ে দিন-দুয়েক লুকিয়ে রাখেন।
খানসাহেবের দুরভিসন্ধি যে কি তা বুঝতে উক্ত জেলারের মোটেই অসুবিধা হয়নি। তিনি মুজিবের ‘সেলের’ পাশে একটি অগভীর কবর খোঁড়েন এবং যুদ্ধ যখন প্রায় শেষ হয়ে এসেছে তখন প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়ার ‘জল্লাদ বাহিনীকে’ একটি ভুয়া নথি দেখিয়ে জানিয়ে দেন যে, অকটোবর মাসের শেষাশেষি শেখ মুজিবকে হত্যা করা হয়েছে।’২১ ডিসেম্বর জুলফিকার আলি ভুট্টোকে ক্ষমতা দিয়ে ইয়াহিয়া খান সটকে পড়ায় বঙ্গবন্ধু কসাইয়ের রোষানল থেকে বেঁচে যান। ভুট্টো ক্ষমতায় বসেই রাওয়ালপিন্ডিতে বিদেশী সাংবাদিকদের এক সংবর্ধনায় ঘোষণা দেন- শেখ মুজিবকে জেল থেকে শীঘ্রই ছেড়ে দেওয়া হবে এবং তাঁকে গৃহবন্দির মতো অন্তরীণ রাখা হবে।
এর মধ্যেই খবর ছড়িয়ে পড়ে বঙ্গবন্ধুকে চিনের রাজধানী পিকিং-এ নিয়ে যাওয়া হয়েছে। লন্ডনের একটি সান্ধ্য পত্রিকা এ খবরটি দেয়।

২৩ ডিসেম্বর কলকাতা থেকে স্বাধীন বাংলা সরকারের মন্ত্রিপরিষদ ঢাকায় আসেন। ফলে মুজিবনগর থেকে ঢাকায় রাজধানী স্থানান্তরিত হয়। তারপর থেকে বঙ্গবন্ধুর মুক্তির জন্য বাংলাদেশ সরকারের কূটনৈতিক প্রচেষ্টা আরো জোরদার হয়।

এদিকে একই দিন রাওয়ালপিন্ডিতে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে ভুট্টো আলোচনায় বসেন। চার দিন পর আবার ভুট্টো বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে দেখা করতে যান। ৩০ ডিসেম্বর পাকিস্তান টাইমসের একটি নিউজে বলা হয়, পাকিস্তানের নয়া প্রেসিডেন্ট মি. ভুট্টো শেখ মুজিবুর রহমানকে বলেছেন, যেমন চান তেমনই স্বায়ত্তশাসন পাবেন। কিন্তু একটি শর্ত আছে এবং তা হচ্ছে এমন একটি পথ খুঁজে বের করতে হবে যাতে পাকিস্তানের কাঠামোর মধ্যেই দুই অংশ থাকতে পারে।পাকিস্তানেই বঙ্গবন্ধুর মুক্তির জন্য জনমত সৃষ্টি হতে থাকে। করাচীর ‘দ্য ডন’ পত্রিকার সম্পাদকীয়তে বলা হয়: ‘আমরা কিসের জন্য অপেক্ষা করছি?’
২ জানুয়ারি করাচীতে বঙ্গবন্ধুর মুক্তির ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য পাকিস্তানের উচ্চ পর্যায়ের সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়।
৩ জানুয়ারি পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট জুলফিকার আলি ভুট্টো ঘোষণা দেন- ‘পাকিস্তানের আরও অন্তত একদফা আলোচনার পর তিনি বিনা শর্তে শেখ মুজিবুর রহমানের মুক্তি দেবেন।

রেডিও পাকিস্তানের খবরে বলা হয়, প্রেসিডেন্ট ভুট্টো বলেছেন, শেখ মুজিবের সঙ্গে বিশদ আলোচনার জন্য তিনি রাওয়ালপিন্ডি ফিরে যাবেন। করাচীর নিশ্তার পার্কে এক জনসভায় ভাষণদানকালে তিনি বলেন, শেখ মুজিব একজন ‘দেশভক্ত পাকিস্তানী এবং এ-ব্যাপারে ভারতের হস্তক্ষেপ করার দরকার নেই।’
তিনি বলেন, আটদিন আগে তিনি যখন রাওয়ালপিন্ডিতে শেখ মুজিবের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন তখন শেখ মুজিব তাঁকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, তিনি মুক্ত কিনা?
প্রেসিডেন্ট ভুট্টো বলেন, শেখ মুজিবের প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেছিলেন যে, তাঁর প্রেসিডেন্ট ভুট্টোর দিক থেকে তিনি মুক্ত। তবে তাঁকে জনগণের সঙ্গে পরামর্শ করতে হবে।প্রেসিডেন্ট ভুট্টো করাচীর নিশ্তার পার্কে এক বিরাট জনসভায় তাঁর শ্রোতাদের জিজ্ঞাসা করেন যে, তাঁরা শেখ মুজিবুরের মুক্তি অনুমোদন করেন কিনা? শ্রোতারাভ
একবাক্যে তাঁদের অনুমোদন জ্ঞাপন করেন। সভায় কয়েক লক্ষ শ্রোতা ছিলেন।
প্রেসিডেন্ট ভুট্টো তাঁর শ্রোতাদের বলেন যে, তাঁরা তাঁকে এক বিরাট বোঝা থেকে মুক্ত করলেন।

কিন্তু বঙ্গবন্ধুর মুক্তি নিয়ে পাকিস্তানের এই দীর্ঘসূত্রিতা আন্তর্জাতিক মহলে আলোচনার বিষয় হয়ে দাঁড়ায়। অনেকেই একে পাকিস্তানের রাজনৈতিক ধাপ্পাবাজি বলে চিহ্নিত করে।
৪ জানুয়ারি বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্দুস সামাদ আজাদ জানান বঙ্গবন্ধুকে আনার জন্য বিমান প্রস্তুত রাখা হয়েছে।
৬ জানুয়ারি পাক সরকারি মহলের খবরে জানানো হয়, জাতিসংঘের বিশেষ প্রতিনিধি মি. ডি ডোরিয়ো উইনস্পিয়ার গুইসিয়ারদির সঙ্গে বঙ্গবন্ধু ঢাকার পথে যাত্রা করবেন।
মুজিব তখন রাওয়ালপিন্ডিতে গৃহবন্দি।

৮ জানুয়ারি পাক বেতারে ঘোষণা করা হয় যে, শেখ মুজিবুর রহমান আজ প্রত্যুষে ৩টার সময় পাক সরকারের ভাড়া করা একটি বিমানে অজ্ঞাত স্থানের উদ্দেশ্যে রওয়ানা দিয়েছেন। প্রেসিডেন্ট ভুট্টো রাওয়ালপিন্ডি বিমানঘাঁটিতে উপস্থিত থেকে বিদায় সম্বর্ধনা জানিয়েছেন। কিন্তু রাওয়ালপিন্ডি থেকে তাঁর যাত্রার ১০ ঘণ্টা পর্যন্ত কোনো খবর না পাওয়ায় সকলের মনে উৎকণ্ঠার সৃষ্টি হয় এবং নানারূপ গুজব রটাতে থাকে। অবশেষে বেলা প্রায় আড়াইটার সময় লন্ডন থেকে প্রেরিত রয়টারের খবরে জানা যায় যে, শেখ মুজিবুর রহমান লন্ডনের বিমান ঘাঁটিতে পৌঁছেছেন। তবে তাঁর ভবিষৎ কর্মপন্থা ও গন্তব্যস্থল সম্পর্কে কিছুই জানা যায়নি। তিনি তখন পর্যন্ত কোনো বিবৃতি দেননি।

পরে জানা যায়, ৮ জানুয়ারি শনিবার বেলা সাড়ে এগারোটায় পাকিস্তানের একটি বিশেষ বিমানে বঙ্গবন্ধু লন্ডনের হিথরো বিমান বন্দরে উপস্থিত হন।
বঙ্গবন্ধু লন্ডন থেকে টেলিফোনে বাংলাদেশের অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, ভারতের প্রধানমন্ত্রী শ্রীমতী গান্ধী এবং ঢাকায় তাঁর স্ত্রী ও পুত্রের সঙ্গে কথা বলেন।
ভারতীয় সময় বেলা আড়াইটায় রেডিও পাকিস্তান ঘোষণা করে যে, শেখ মুজিবের ইচ্ছানুসারে একটি বিশেষ পাক বিমানে তাঁকে লন্ডনে পৌঁছে দেওয়া হয়েছে। তিনি লন্ডনের ক্লারিজ হোটেলে অবস্থান করছেন।

অপরাহ্নে লন্ডন থেকে শেখ মুজিব নয়াদিল্লীর অশোকা হোটেলে বাংলাদেশের কূটনৈতিক জনাব হোসেন আলীর সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলেন। বেলা প্রায় চারটা নাগাদ বঙ্গবন্ধু ফোনে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জনাব আব্দুস সামাদের সঙ্গে কথা বলতে চান। জনাব সামাদ সে সময় হোটেলে ছিলেন না। শেখ মুজিব তখন জনাব আলীর সঙ্গে কথা বলেন।

বিকালে ঢাকায় বঙ্গবন্ধুর বড় ছেলে লেফটেন্যান্ট শেখ কামালও ফোনে তাঁর বাবার সঙ্গে কয়েক মিনিট কথা বলেন। বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান লন্ডন থেকে টেলিফোনে অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলামের সঙ্গেও কথা বলেন। জনাব ইসলাম তাঁকে বাংলাদেশের সর্বশেষ পরিস্থিতির বিষয়ে জানান।
বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশের জনগণের অবস্থা ও সরকারের কাজকর্ম সম্পর্কে জানতে চান।

সৈয়দ নজরুল ইসলাম তাঁকে জানান যে, সারাদেশ এখন সরকারের নিয়ন্ত্রণে। এখানে সম্পূর্ণভাবে আইনশৃঙ্খলা বিরাজমান।
বঙ্গবন্ধু ফোনে যোগাযোগমন্ত্রী শেখ আব্দুল আজিজ, দুজন এমএলএ এবং একজন এমপিএ-র সঙ্গেও কথা বলেন। এ সময়ও তিনি বাংলাদেশের জনগণের ভালো-মন্দের সংবাদ জানতে চান। বঙ্গবন্ধু তাঁর মা-বাবা এবং স্ত্রী-পুত্র পরিবারের কুশল প্রশ্ন করেন।
অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি তাঁকে জানান যে, দেশের জনগণ তাঁর স্বদেশ-প্রত্যাবর্তনের জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে।

‘এপি’ জানায়, বঙ্গবন্ধু হিথরো বিমান বন্দরের ভিআইপি লাউঞ্জে এসে লন্ডনস্থ বাংলাদেশ মিশনের পদস্থ কর্মচারী পরিবৃত হয়ে বসেছিলেন। তাঁর পরনে ছিল গলা খোলা সাদা সার্ট, ধোঁয়াটে রঙের সুট এবং ওভার কোট। তিনি নীরবে বসে পাইপ থেকে ধূমপান করছিলেন।
বাংলাদেশ মিশনের জনৈক অফিসার বলেন, বঙ্গবন্ধু সুস্থ আছেন, তবে তিনি খুব ক্লান্ত। মুখপাত্রটি জানান, আমাদের সবার কাছে এ এক অভূতপূর্ব আনন্দের দিন। বিমানবন্দর থেকে শেখ মুজিবকে ক্লারিজ হোটেলে নিয়ে যাওয়া হয়।
ফটোগ্রাফারদের সামনে দাঁড়িয়ে মুজিব হাসতে হাসতে বলেন, দেখুন আমি কেমন সুস্থ আছি। এই মুহূর্তে সকলে আমায় দেখুক, কিন্তু আমি কিছু বলবো না। সম্ভবত পরে আমি একটি বিবৃতি দেব।
ভুট্টোর নির্দেশে লন্ডনস্থিত পাক হাই কমিশনার বিমানবন্দরে মুজিবকে সম্বর্ধনা জানাতে উপস্থিত হননি। কিন্তু তিনিই মুজিবের ক্লারিজ-এ থাকার ব্যবস্থা করেছেন।

বিমানবন্দরে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে সর্বপ্রথম সাক্ষাৎ করেন আয়ান সাদারল্যান্ড। ক্লারিজ-এ মুজিবের সঙ্গে প্রথম দেখা করতে আসেন ভারতীয় হাইকমিশনার আপা পন্থ।
বঙ্গবন্ধুর লন্ডন যাত্রার খবর এমনভাবে গোপন রাখা হয়েছিল যে, পাকিস্তান এয়ারলাইনস-এর লন্ডনস্থ কর্মীরাও বিমান অবতরণের পূর্ব মুহূর্তে সে খবর জানতে পারেন নি। লন্ডনস্থ পিআইএ-র জনৈক অফিসার বলেন, এটি রাওয়ালপিন্ডি থেকে বিশেষ একটি ফ্লাইট।

বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে তাঁর উপদেষ্টা ড. কামাল হোসেন সপরিবারে বিমানে ছিলেন। ক্লারিজ হোটেল থেকে টেলিফোনে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব তাঁর পত্নী এবং পুত্র-কন্যাদের সঙ্গে কথা বলেন। এই অভাবনীয় মুহূর্তে হাজার হাজার মাইল দূর থেকে সেই চির পরিচিত কণ্ঠস্বরগুলো আবার শুনতে পেলেন বঙ্গবন্ধু। ‘আব্বা, আমরা ভালো আছি’- প্রথমেই যার কথা তিনি শুনলেন সে হচ্ছে তার জ্যেষ্ঠ পুত্র লেফটেন্যান্ট কামাল।

বঙ্গবন্ধুর প্রথম প্রশ্ন, ‘তোমরা সকলে জীবিত আছ তো?’ পুত্রের জবাবে আশ্বস্ত হয়ে শেখ সাহেব বললেন, ‘আমি ভালো আছি। খুব তাড়াতাড়িই যাচ্ছি তোমাদের কাছে।’মহানায়ক এলেন

১০ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু নয়া দিল্লি হয়ে ঢাকায় আসেন। দুপুর পৌণে দুটো (ভারতীয় সময় দুপুর সওয়া একটা) নাগাদ বিমানটি বাঁ দিকে হেলে নেমে আসতে থাকে রানওয়ের দিকে। কিছুক্ষণ আগে পর্যন্ত যা একটি বিন্দু ছিল, এখন তা বিরাট আকার নিয়েছে। মঞ্চের কাছেই লাল সালু দিয়ে মোড়া একটি ছোট ট্রাক অপেক্ষা করছিল। জাতীয় পতাকা এবং ভারতের প্রধানমন্ত্রী শ্রীমতী ইন্দিরা গান্ধীর একটি ছবি দিয়ে গাড়িটি সাজান। এতে করেই তিনি রমনার রেসকোর্স ময়দানে যান।

বিমানটি নামতে দেখে বাংলাদেশের স্থল, নৌ ও বিমানবাহিনীর সেনারা সারি বেঁধে দাঁড়াতে সুরু করেন। তাঁরা রাষ্ট্রপতিকে গার্ড অব অনার দেন। একদিকে মিত্র ভারতীয় বাহিনীর জওয়ানরাও দাঁড়িয়ে ছিলেন।
শ্লোগানে, করতালিতে কাঁপছে সমগ্র এলাকা। অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি নজরুল ইসলামের নেতৃত্বে প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ ও অন্যান্য মন্ত্রীরা কর্ণধারকে বরণ করার জন্য এগিয়ে যান।
সাদা ও নীল রঙের ব্রিটিশ রাজকীয় বিমানবহরের বিমানটি প্রচণ্ড গর্জন তুলে রানওয়ের ওপর নেমে এলে সঙ্গে সঙ্গে জনসমুদ্রের স্বাগত আহ্বানের শব্দ কমেটের গর্জনকে যেন চাপা দিয়ে দিলো। একটি খোলা গাড়ি বিমানটিকে টারম্যাকের পথ দেখিয়ে আনতে থাকে।

জনতা এতক্ষণ পর্যন্ত ছিল শান্ত, সংযত। এবার বাঁধ ভাঙল শাসনের। ভেঙে পড়ল নিরাপত্তা বেষ্টনী। জনস্রোতের খানিকটা অংশ বন্যার মতো ছুটে গিয়ে বিমানটিকে যেন গ্রাস করে নিলো। শৃঙ্খল মোচনের আবেগের কাছে হার মানল শৃঙ্খলা। অবশ্য তা ফিরেও এলো অল্পক্ষণের মধ্যেই।

বিমানের গায়ে সিঁড়ি লাগান হলে একজন বৈমানিক দরজা খুলে উঁকি মারলেন। চারদিকে এত কোলাহল। তবু মনে হয় সমস্ত চত্বরটা এখন নীরব, যেন সুচপতনের শব্দ পর্যন্ত পাওয়া যাবে। পরমুহূর্তেই কিন্তু সেই কাল্পনিক নীরবতাকে টুকরো টুকরো করে ছিঁড়ে প্রাণপ্রিয় জনতাকে কাছে পাওয়ায় জনতার আবেগ বিস্ফোরিত হলো: জয় বাংলা। জয় মুজিব। জয় ইন্দিরা। ভারত-বাংলাদেশ মৈত্রী জিন্দাবাদ।

ঢাকায় অবতরণ করার প্রায় আড়াই ঘণ্টা পর তিনি রেসকোর্স ময়দানে স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে পাকিস্তানিদের উদ্দেশ্যে অশ্রুরুদ্ধকণ্ঠে বলেন, ‘তোমরা আমার মা-বোনদের ধর্ষণ করেছ, তোমরা আমার ৫০ লাখ লোককে খুন করেছ। তোমরা অসংখ্য ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দিয়েছ। আমার এক কোটি লোককে তাড়িয়ে দিয়েছ। আমার কত লোক না খেয়ে রোগে মরেছে। কত বড় পাষণ্ড তোমরা, তবুও তোমাদের বিরুদ্ধে আমার বিদ্বেষ নেই। তোমরা সুখে থাকো। স্বাধীন দেশ হিসেবে তোমাদের সঙ্গে যদি কোনো সম্পর্ক হতে পারে, তবে কেবল ততটুকুই হবে। তার বেশি নয়।’

ভারতের প্রধানমন্ত্রী শ্রীমতী ইন্দিরা গান্ধীর প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে তিনি বলেন যে, এমন কোনো রাষ্ট্রপ্রধান নেই, যাঁর কাছে শ্রীমতী গান্ধী তাঁর মুক্তির জন্য অনুরোধ করেননি।
তিনি যখন সভায় ভারতবর্ষের প্রধানমন্ত্রী ও জনগণের কথা বলছিলেন তখন সভার লাখ লাখ কণ্ঠ হর্ষধ্বনি করে ওঠে।

সূত্র: বঙ্গবন্ধুর কলকাতা জয়, জয়দীপ দে ও তৎকালীন পত্রপত্রিকা