ঢাকা, শনিবার, ১লা অক্টোবর, ২০২২ খ্রিস্টাব্দ, ১৬ই আশ্বিন, ১৪২৯ বঙ্গাব্দ

পায়ে হাত দিয়ে সালাম কি জায়েয?

সালাম একটি আরবি শব্দ।  আরবিতে  (ٱلسَّلَامُ عَلَيْكُمْ وَرَحْمَةُ ٱللَّٰهِ وَبَرَكَاتُهُ‎‎) ।  এর অর্থ হচ্ছে শান্তি, প্রশান্তি কল্যাণ, দোয়া, আরাম, আনন্দ, তৃপ্তি।  সালামের মাধ্যেমে পরস্পরের মধ্যে বন্ধুত্ব ও সুসম্পর্ক তৈরি হয়।  ‘আস্‌-সালাম’ আল্লাহর সুন্দর নামসমূহের মধ্যে একটি অন্যতম নাম এবং জান্নাতের নাম সমূহের মধ্যে একটি জান্নাতের নাম।

সালাম আমাদের জীবনে অনেক শান্তি ও সুখ আনে।  আমরা অনেকেই বিভিন্ন অনুষ্ঠান, বিয়ে, বিদায় বা মিলনের সময় গুরুজন এবং মুরুব্বীদের পা ছুঁয়ে সালাম করি।  উপমহাদেশে বিশেষ করে ভারত ও বাংলাদেশেই মূলত: পাঁ ছুঁয়ে সালাম করার একটা সংস্কৃতি বা রেওয়াজ চালু রয়েছে।  অধিকাংশ ক্ষেত্রে অবশ্য মেয়েরাই পা ছুঁয়ে সালাম করেন।

হিন্দু সমাজে বেদের শিক্ষক তথা পুরোহিত থেকে শুরু করে গুরুজনেরা মূলত: ব্রাহ্মণ সম্প্রদায়ের হয়।  আর হিন্দু ধর্ম মতে ব্রাহ্মণরা বিশেষ করে ব্রাহ্মণ পুরোহিতরা হচ্ছে ঈশ্বরের প্রতিনিধি।  ঈশ্বরের প্রতিনিধি হিসেবে তারা সাধারণ হিন্দুদের কাছে পূজনীয় হিসেবে বিবেচিত হয়।

মনুসংহিতাতে বেদের ছাত্রদেরকে উদ্দেশ্য করে বলা হয়েছে, বেদ শিক্ষার প্রতিটি পাঠের শুরুতে ও শেষে একজন ছাত্র অবশ্যই তার গুরুর দুই পা ছুঁয়ে আলিঙ্গন করবে। এই পা ছুঁয়ে আলিঙ্গন করাকে ব্রহ্মঞ্জলী বলা হয়।

এবার আসুন ইসলাম সালের পদ্ধতি সম্পর্কে কি বলে?

ইসলাম ধর্মে একমাত্র আল্লাহ ব্যতীত অন্য কারও সামনে মাথা নত করা নিষেধ।  যেহুতু পা ছুঁয়ে সালাম করা নিষেধ।  কেননা পা ছুঁয়ে সালাম করতে গেলে আরেকজনের সামনে মাথা নত করতে হয়।  তাই যে কাউকে পা ছুঁয়ে সালাম করা ইসলামে নিষিদ্ধ।

ইসলামে একজন মুসলিম আর একজন মুসলিমকে দেখলে সালাম দিবে একে অন্যের সাথে হাত মিলাবে।  আরব দেশগুলোতে কপালে চুম্বনের একটি রীতি রয়েছে।  রসূল (সা.) যখন ইন্তেকাল করলেন তখন আবুবকর (রা.) তার কপালে চুম্বন করেছিলেন।  সে হিসেবে এটি সাহাবীদের একটি সূন্নত যা পালন করা যায়।  মানুষ মানুষের প্রতি ভালবাসতে গিয়ে অতিরঞ্জিত করে ফেলে। প্রতিটি ইবাদত হতে হবে আল্লাহর নির্দেশিত ও রসূল সা: এর অনুসরণে। রসূল সা: যা করেছেন ও করতে বলেছেন সেভাবেই হবে উম্মতের ইবাদত।

১. হাদীসে এসেছে যে,
হযরত আনাস বিন মালিক রাঃ থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, জনৈক ব্যক্তি বলল, হে আল্লাহর রাসূল! আমাদের কারো যদি তার ভাই বা তার বন্ধুর সাথে সাক্ষাৎ হয়, তবে কি সে তার অভিবাদন এর জন্য মাথা ঝুঁকাবে? তিনি বললেন, না।  লোকটি বলল, তাহলে কি তাকে লেপ্টে ধরবে এবং চুমু খাবে? তিনি বললেন, না।  তাহলে কি তার হাত ধরবে এবং তার সাথে মুসাফাহা করবে? তিনি বললেন, হ্যাঁ।

ইমাম তিরমিজী রহঃ বলেন, হাদীসটি হাসান। {সুনানে তিরমিজী, হাদীস নং-২৭২৮, বাংলা ২৭২৯, মুসনাদে আহমাদ, হাদীস নং-১৩০৪৪}

এ হাদীসে রাসূল সাঃ মাথা নুয়াতে এবং চুমু খাওয়াতে নিষেধ করেছেন।

পা ছুঁয়ে সালাম করা, কদমবুসি করা বা পায়ে চুমু খাওয়া, পদধূলি নেওয়া– এ সবগুলো হচ্ছে মুশরিক জাতি হিন্দুদের অনুকরণে নিকৃষ্ট বিদআ’ত।  মূলত কবর মাযার পূজারী আর ভন্ড পীর পূজারীরা মুসলমানদের মাঝে এই কুপ্রথা ঢুকিয়েছে।

২. গায়রুল্লাহের সামনে মাথাকে অবনত করা হয়।  যা হারাম।
হযরত কাতাদা রাঃ থেকে বর্ণিত। রাসূল সাঃ ইরশাদ করেছেন, যখন তোমাদের কেউ ঘরে প্রবেশ করে সে যেন উক্ত গৃহবাসীকে সালাম দেয়। আর গৃহ হতে বের হওয়ার সময় গৃহবাসীকে সালাম দিয়ে বিদায় গ্রহণ করবে। {জামে মামার বিন রাশেদ, হাদীস নং-১৯৪৫০, শুয়াবুল ঈমান, হাদীস নং-৮৪৫৯, শরহুস সুন্নাহ লিলবাগাবী, হাদীস নং-৩৩২৮}
.
* হযরত আনাস বিন মালিক রাঃ থেকে বর্ণিত। রাসূল সাঃ আমাদের লক্ষ্য করে বললেন, হে বৎস! তুমি গৃহে পরিবার-পরিজনের কাছে প্রবেশকালে সকলকে সালাম করবে। এতে তোমার এবং তোমার গৃহের সকলের জন্য কল্যাণ হবে। {সুনানে তিরমিজী, [বাশশার], হাদীস নং-২৬৯৮, আলমুজামুল আওসাত, হাদীস নং-৫৯৯১}

* হযরত আমর বিন শুয়াইব তার পিতার সূত্রে তার দাদা হতে বর্ণনা করেন, রাসূল সাঃ ইরশাদ করেছেন, যে ব্যক্তি আমাদের ছাড়া অন্য কোন সম্প্রদায়ের সাথে সাদৃশ্য রেখে চলে, যে আমাদের দলের নয়। তোমরা ইয়াহুদী ও খৃষ্টানদের সাথে সাদৃশ্য স্থাপন করো না। ইহুদীরা সালাম করে আঙ্গুলির ইশারা দ্বারা আর খৃষ্টানরা সালাম করে হাতের তালুর ইশারা দ্বারা। { সুনানে তিরমিজী, [বাশশার], হাদীস নং-২৬৯৫, শুয়াবুল ঈমান, হাদীস নং-৮৫২০, সুনানে কুবরা লিননাসায়ী, হাদীস নং-১০১০০, শরহুস সুন্নাহ, হাদীস নং-৩৩০৮, আলমুজামুল আওসাত, হাদীস নং-৭৩৮০, মুসনাদুশ শামীন, হাদীস নং-৫০৩, মুসনাদুশ শিহাব, হাদীস নং-১১৯১}

* হযরত বারা বিন আযেব রাঃ থেকে বর্ণিত। রাসূল সাঃ ইরশাদ করেছেন, যখন দুজন মুসলিমের মাঝে পরস্পর সাক্ষাৎ হয়, তারপর তারা পরস্পর মুসাফাহা করে, তাহলে তারা পরস্পর থেকে পৃথক হওয়ার আগেই তাদের গোনাহ মাফ করে দেয়া হয়। {শরহুস সুন্নাহ লিলবাগাবী, হাদীস নং-৩৩২৬, মুসনাদে আহমাদ, হাদীসি নং-১৮৫৪৭, সুনানে ইবনে মাজাহ।

* হযরত আয়শা রাঃ থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, হযরত জায়েদ বিন হারেসা রাঃ মদীনায় এলেন।  তখন রাসূল সাঃ আমার গৃহে ছিলেন।  হযরত জায়েদ এসে রাসূল সাঃ এর দরজায় কড়া নাড়লেন।  রাসূল সাঃ তখন বেরিয়ে গেলেন খালি গায়েই। আল্লাহর কসম আমি এর আগে কখনো রাসূল সাঃ কে খালি গায়ে দেখিনি। তারপর তিনি তার সাথে মুআনাকা করলেন এবং তাকে চুমু খেলেন। {তাহাবী শরীফ, হাদীস নং-৬৯০৫, সুনানে তিরমিজী, হাদীস নং-২৭৩২, শরহুস সুন্নাহ, হাদীস নং-৩৩২৭}