জ্বালানি ও প্রাকৃতিক সম্পদ ব্যবস্থাপনার মতো কৌশলগত খাতে জাতীয় সক্ষমতা ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী না করার সমালোচনা করেছেন গণতান্ত্রিক অধিকার কমিটির সদস্য অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ।
তিনি বলেছেন, “নিজেদের সক্ষমতা না বাড়ানোর পরিবর্তে বিদেশি বহুজাতিক কোম্পানির ওপর আত্মঘাতী নির্ভরতা এবং অসম চুক্তি জনস্বার্থকে চরম ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে।”
ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের তিন দিন আগে ৯ ফেব্রুয়ারি মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকার যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তি করে যায়। এ চুক্তি নিয়ে এখন ব্যাপক সমালোচনা চলছে।
গণতান্ত্রিক অধিকার কমিটি আয়োজিত এই সভায় আনু মুহাম্মদ বলেন, “রাষ্ট্রীয় কাঠামোর গভীরে জাঁকিয়ে বসা মানসিক দুর্নীতি, সিদ্ধান্ত গ্রহণে অস্বচ্ছতা এবং নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে জবাবদিহির চরম ঘাটতি আজ প্রশাসন থেকে শুরু করে বিচারব্যবস্থা পর্যন্ত প্রতিটি স্তরে গণতান্ত্রিক ভারসাম্যকে বিপর্যস্ত করে তুলেছে।”
অবসরে যাওয়া জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের এই অধ্যাপক বলেন, “রাষ্ট্র যখন ক্ষমতাকে অতিমাত্রায় কেন্দ্রীভূত করে ভিন্নমত দমনের পথ বেছে নেয় এবং শিক্ষা, জ্বালানি ও প্রশাসনের মতো মৌলিক খাতগুলোর কাঠামোগত সংস্কার উপেক্ষা করে, তখন তা কেবল সামাজিক ন্যায়বিচারকেই বাধাগ্রস্ত করে না বরং উন্নয়নের নামে এক ধরনের কাঠামোগত বৈষম্য ও আস্থার সংকট তৈরি করে।”
এই সংকট উত্তরণে তিনি অবিলম্বে জাতীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বায়ত্তশাসন নিশ্চিত করা, সম্পদের ওপর রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা এবং মুক্তিযুদ্ধ ও জনগনের ইতিহাসের চেতনাকে ধারণ করে একটি অংশগ্রহণমূলক ও স্বচ্ছ শাসনব্যবস্থা গড়ে তোলার জোর দাবি জানান।
গণতান্ত্রিক অধিকার কমিটির উদ্যোগে আয়োজিত এই সভায় সভাপতিত্ব করেন অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ।
সভায় অন্যদের বক্তব্য রাখেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক মোশাহিদা সুলতানা ঋতু, সামিনা লুৎফা নিত্রা, লেখক ও গবেষক আলতাফ পারভেজ, ব্যারিস্টার জ্যোতির্ময় বড়ুয়া এবং আইনজীবী মানজুর আল মতিন।
মোশাহিদা সুলতানা ঋতু বলেন, “জ্বালানি খাতে বারবার সংকট দেখিয়ে তড়িঘড়ি সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রবণতা দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনাকে বাধাগ্রস্ত করছে। এতে রাষ্ট্রীয় সম্পদের অপচয় এবং জনগণের ওপর অতিরিক্ত অর্থনৈতিক চাপ সৃষ্টি হচ্ছে।”
তিনি বলেন, জ্বালানি ও পরিবহন খাত সমন্বিত পরিকল্পনার পরিবর্তে বিচ্ছিন্নভাবে পরিচালিত হওয়ায় সামগ্রিক উন্নয়ন ব্যাহত হচ্ছে। নীতিনির্ধারণে সামাজিক বাস্তবতা ও জনগণের অভিজ্ঞতাকে উপেক্ষা করা হচ্ছে।
‘সোলার রোডম্যাপ’ প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, “বর্তমান পরিকল্পনা বাস্তবসম্মত নয় এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থা অর্জনে ব্যর্থ হয়েছে। নীতির অস্থিরতা ও কার্যকর প্রণোদনার অভাবে নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি হয়নি।”
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সামিনা লুৎফা বলেন, “বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় দীর্ঘদিন ধরে বিদ্যমান সংকট ও বৈষম্য একটি মানবিক ও সুসংগঠিত শিক্ষা আন্দোলনের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরছে।
“শিক্ষকদের মর্যাদা, পারিশ্রমিক ও নিরাপত্তার ক্ষেত্রে বিদ্যমান বৈষম্য, বিশেষ করে এমপিও ও নন-এমপিও বিভাজন, শিক্ষাক্ষেত্রকে দুর্বল করে তুলছে।”
এ প্রেক্ষিতে তিনি একটি একীভূত ও মর্যাদাসম্পন্ন জাতীয় শিক্ষক কাঠামোর দাবি জানান।
মাধ্যমিক স্তরে শিক্ষার্থীদের উচ্চ ঝরে পড়ার হারকে কাঠামোগত ব্যর্থতার প্রতিফলন হিসেবে তুলে ধরে সামিনা লুৎফা বলেন, “একটি ধারাবাহিক ও মানবিক শিক্ষা সংস্কার এখন সময়ের দাবি।”
তিনি শিক্ষা খাতে আসন্ন জাতীয় বাজেটের অন্তত ৫ শতাংশ বরাদ্দ নিশ্চিত করার আহ্বান জানান।