অপরাজিতা অর্পা (সাভার প্রতিনিধি) ঢাকা: গোপন তথ্য সংরক্ষণ ও সুরক্ষায় নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব কানেকটিকাট ও চীনের সাউথওয়েস্ট পেট্রোলিয়াম ইউনিভার্সিটির গবেষকদের উদ্ভাবিত বিশেষ ধরনের ‘স্মার্ট প্লাস্টিক’। কোনো ইলেকট্রনিক সিস্টেম ছাড়াই এই উপাদান গোপন বার্তা লুকাতে, প্রদর্শন করতে এবং পুনরায় অদৃশ্য করতে সক্ষম—যা তথ্য নিরাপত্তায় নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে।
গবেষকেরা জানিয়েছেন, প্লাস্টিকটি পানিতে ডুবালে প্রথমে একটি ভুয়া বার্তা চোখে পড়ে, পরক্ষণেই প্রকাশ পায় আসল বার্তা। কিছু সময় পর উপাদানটি অস্বচ্ছ হয়ে গেলে দুটি বার্তাই অদৃশ্য হয়ে যায়। শুকিয়ে নিয়ে তাপ প্রয়োগ করলে প্লাস্টিকটি আবার নতুন করে তথ্য গ্রহণের উপযোগী হয়। বিষয়টি বৈজ্ঞানিক মহলে তথ্য সুরক্ষার ভৌত (ফিজিক্যাল) পদ্ধতিকে নতুন করে আলোচনায় এনেছে।
নতুন থার্মোসেট পলিমার ব্যবহার করে তৈরি এই প্লাস্টিকের অভ্যন্তরে বোরোক্সিন ও হাইড্রোজেন-বন্ডের গতিশীল রসায়ন কাজ করে। তাপ বা পানির সংস্পর্শে এই বন্ধন ভাঙা ও পুনর্গঠন সম্ভব হওয়ায় উপাদানটি স্ব-নিরাময়, আকৃতি পরিবর্তন, পুনর্ব্যবহারসহ বার্তা প্রদর্শনের ধাপগুলো নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। এটি ডিজিটাল এনক্রিপশন থেকে ভিন্ন, সম্পূর্ণ ভৌত উপায়ে তথ্য সুরক্ষার একটি স্বতন্ত্র পদ্ধতি।
উদ্ভাবনের বিশেষত্ব বাড়িয়েছে উপাদানটির আকৃতি–স্মৃতি বা শেপ-মেমোরি বৈশিষ্ট্য। গবেষকেরা জানান, তথ্য ত্রিমাত্রিক বা ভাঁজ করা অবস্থাতেও সংরক্ষণ করা যায়। প্লাস্টিক যখন উত্তাপে আবার সমতল আকারে ফিরে আসে, তখনই প্রকৃত তথ্য দৃশ্যমান হয়। ফলে উপাদানটি অরিগামির মতো ভাঁজ-ভিত্তিক এনক্রিপশন ধারণায়ও কাজ করতে পারে।
গবেষণার সহ-লেখক আব্বাস আহমেদ বলেন, “আমরা এমন একটি উপাদান তৈরির চেষ্টা করেছি যা স্মৃতির মতো আচরণ করবে। যা লেখা, মুছা এবং পুনরায় ব্যবহার করা যায়। কিন্তু এর জন্য কোনো বিদ্যুৎ বা ডিজিটাল নেটওয়ার্কের প্রয়োজন হয় না। এটি সম্পূর্ণ নিরাপদ ও দৃশ্যমান।” তিনি আরও বলেন, “সুরক্ষা ও টেকসই উন্নয়নকে আলাদা ধরা হয়, কিন্তু এই প্লাস্টিক দেখিয়েছে—এ দুটিকে একইসঙ্গে অর্জন করা সম্ভব।”
তথ্য সুরক্ষা, পরিচয় সংরক্ষণ, স্মার্ট প্যাকেজিং, লেবেলিংসহ বিভিন্ন শিল্পক্ষেত্রে প্লাস্টিকটি নতুন সম্ভাবনার ইঙ্গিত দিচ্ছে। গবেষকদের মতে, ডিজিটাল হ্যাকিংয়ের ঝুঁকি বেড়ে যাওয়ায় ভৌত উপাদান–নির্ভর এনক্রিপশন ভবিষ্যতে তথ্য নিরাপত্তার একটি শক্তিশালী দ্বিতীয় স্তর হিসেবে কাজ করতে পারে। একই সঙ্গে পরিবেশবান্ধব উপাদান হিসেবে এর পুনর্ব্যবহারযোগ্য বৈশিষ্ট্য টেকসই শিল্পব্যবস্থার দিকেও নতুন দিশা দেখাচ্ছে।
গবেষণা নিবন্ধটি বৈজ্ঞানিক জার্নাল Advanced Functional Materials-এ প্রকাশিত হয়েছে। বিজ্ঞানীরা মনে করছেন, ভবিষ্যতে তথ্য সুরক্ষায় স্মার্ট উপাদানই বড় ভূমিকা নেবে এবং এই প্লাস্টিক সেই পরিবর্তনের পথপ্রদর্শক হতে পারে।