ঢাকা, রবিবার, ২০শে জুন, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ, ৬ই আষাঢ়, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ

“বিশ্বব্যাপী থ্যালাসেমিয়া রোগীদের মধ্যে স্বাস্থ্য বৈষম্য মোকাবেলা”- প্রতিপাদ্য নিয়ে পালিত হল বিশ্ব থ্যালাসেমিয়া দিবস

৮ মে বিশ্ব থ্যালাসেমিয়া দিবস। থ্যালাসেমিয়া রোগ প্রতিরোধে জনগণের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি করতে প্রতিবছর এ দিবসটি পালিত হয়ে থাকে। বরাবারের মত এবারও দিবসটি পালন করেছে বাংলাদেশ থ্যালাসেমিয়া ফাউন্ডেশন, সন্ধানী, মেডিসিন ক্লাব ও প্ল্যাটফর্ম। এ বছরের প্রতিপাদ্য বিষয়: “বিশ্বব্যাপী থ্যালাসেমিয়া রোগীদের মধ্যে স্বাস্থ্য বৈষম্য মোকাবেলা”। 

বিশ্ব থ্যালাসেমিয়া দিবস পালন করার লক্ষ্যে বাংলাদেশ থ্যালাসেমিয়া ফাউন্ডেশন আয়োজিত একটি অনলাইন সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন অধ্যাপক ডাঃ মনজুর মোরশেদ, রক্তরোগ বিশেষজ্ঞ, আজগর আলী হাসপাতাল। তিনি জানান, থ্যালাসেমিয়া একটি বংশগত রক্তের রোগ। থ্যালাসেমিয়া আক্রান্ত রোগীদের শরীরে রক্তের লাল কণিকা পর্যাপ্ত পরিমাণে তৈরি হয় না। ফলে এদের মারাত্মক রক্তশুন্যতা দেখা দেয়। থ্যালাসেমিয়া রোগীরা প্রতি মাসে ১-২ ব্যাগ রক্ত গ্রহণ করে বেঁচে থাকে। চিকিৎসা না করা হলে এই রোগী রক্তশুন্যতায় মারা যায়। 

শিশু জন্মের ১-২ বছরের মধ্যে থ্যালাসেমিয়া রোগ ধরা পড়ে। এই রোগের লক্ষণগুলো হলো – ফ্যাকাশে হয়ে যাওয়া, দুর্বলতা, ঘন ঘন ইনফেকশন, শিশুর ওজন বৃদ্ধি না হওয়া, জন্ডিস, খিটখিটে মেজাজ, ইত্যাদি। 

থ্যালাসেমিয়া রোগের কোনও সহজলভ্য স্থায়ী চিকিৎসা নেই। এ রোগ থেকে মুক্তির একমাত্র উপায় হচ্ছে প্রতিরোধ। স্বামী-স্ত্রী দুজনই যদি থ্যালাসেমিয়া বাহক হন, শুধুমাত্র তখনই সন্তানদের এ রোগ হতে পারে। কিন্ত স্বামী-স্ত্রী দুজনের একজন যদি বাহক হন এবং অন্যজন সুস্থ হন, তাহলে কখনও এ রোগ হবে না। তাই বিয়ের আগে থ্যালাসেমিয়া বাহক কিনা সবারই জেনে নেয়া দরকার। হিমোগ্লোবিন ইলেকট্রোফোরেসিস নামে একটি রক্ত পরীক্ষার মাধ্যমে থ্যালাসেমিয়া বাহক নির্ণয় করা যায়।

ফাউন্ডেশনের পৃষ্ঠপোষক ও সরকারের সাবেক সচিব আকতারী মমতাজ এ অনুষ্ঠানে বলেন, “সকল থ্যালাসেমিয়া রোগী সুচিকিৎসা পেয়ে এ রোগ মোকাবেলায় সক্ষম হোক ও বাংলাদেশ থ্যালাসেমিয়া মুক্ত হোক এ প্রত্যাশা করি”। তিনি তার বক্তব্যে বাংলাদেশ থ্যালাসেমিয়া ফাউন্ডেশনের অর্জনগুলো তুলে ধরেন এবং এ রোগ প্রতিরোধে যা করণীয় তা করার জন্য আহ্বান জানান। 

সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের মাননীয় মন্ত্রী নুরুজ্জামান আহমেদ এমপি এক বার্তার মাধ্যমে জানান, “বাংলাদেশ সরকার থ্যালাসেমিয়া রোগ নিয়ন্ত্রণে বদ্ধপরিকর, এবং থ্যালাসেমিয়া রোগীদের চিকিৎসার্থে আর্থিকভাবে সার্বিক সহযোগিতা করবে সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়।“

সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব সুলতানা সাইদা সেমিনারে বলেন, “বাংলাদেশ থ্যালাসেমিয়া ফাউন্ডেশনের প্রচেষ্টায় ২০১৯ সালে থ্যালাসেমিয়া রোগটি সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক সহায়তা নীতিমালায় অন্তর্ভুক্ত হয়। ফলে আমরা প্রতিবছর রেজিস্টারকৃত রোগীকে এককালীন ৫০,০০০ টাকা দিয়ে সাহায্য করে থাকি“। এছাড়াও তিনি থ্যালাসেমিয়া রোগ প্রতিরোধে প্রচারের গুরুত্ব দেন এবং জেনেটিক কাউন্সেলিং এর মাধ্যমে এ রোগকে মোকাবিলা করা সম্ভব বলে মনে করেন। তিনি থ্যালাসেমিয়া রোগীদের বাংলাদেশ থ্যালাসেমিয়া ফাউন্ডেশনের ওয়েবসাইটের মাধ্যমে রেজিস্ট্রেশনের জন্য অনুরোধ জানান। 

ডাঃ মোস্তফা জালাল মহিউদ্দিন, সভাপতি, বাংলাদেশ মেডিকেল এ্যাসোসিয়েশন বলেন, “বাংলাদেশ মেডিকেল এ্যাসোসিয়েশন বাংলাদেশ থ্যালাসেমিয়া ফাউন্ডেশনের প্রতিটি কাজে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেবে। কাধে কাধ মিলিয়ে কাজ করার মাধ্যমে আমরা থ্যলাসেমিয়া প্রতিরোধ করতে পারি”। তিনি বিয়ের আগে থ্যালাসেমিয়া বাহক নির্ণয়ের জন্য রক্ত পরীক্ষার মাধ্যমে রোগটি প্রতিরোধ করার বিষয়ে গুরুত্ব আরোপ করেন।

অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি, থ্যালাসেমিয়া ইন্টারন্যাশনাল ফেডারেশন-এর সহ-সভাপতি শোভা তুলি জানান অর্থনৈতিক বৈষম্যের কারণে থ্যালাসেমিয়া রোগীরা সুচিকিৎসা থেকে বঞ্চিত হয়। তাদের উন্নত জীবন ও ভবিষ্যতের জন্য বৈষম্য দূরীকরণ প্রয়োজন।  

এছাড়াও সেমিনারে বক্তব্য রাখেন সন্ধানী-র সভাপতি লুৎফুর রহমান মিলন, মেডিসিন ক্লাবের এজিএস অঙ্কন এবং প্ল্যাটফর্মের সভাপতি ডাঃ ফয়সাল বিন সালেহ। তারা নিজ নিজ প্রতিষ্ঠান থেকে থ্যালাসেমিয়া রোগীদের জন্য কার্যক্রম সেমিনারে তুলে ধরেন।

দিবসটি উপলক্ষে দেয়া বাণীতে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, “থ্যালাসিমিয়া রোগ নিয়ন্ত্রণে প্রতিরোধের কোন বিকল্প নেই। বিয়ের আগে থ্যালাসেমিয়া বাহক নির্ণয়ের জন্য রক্ত পরীক্ষা করে রোগটি সহজেই প্রতিরোধ করা যায়। এ বিষয়ে ব্যাপক জনসচেতনতা ও তরুণ প্রজন্মের অংশগ্রহণ অত্যন্ত জরুরী।” তিনি দেশের যুবসমাজকে থ্যালাসেমিয়া রোগীদের জন্য নিয়মিত স্বেচ্ছায় রক্তদানে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান।