ঢাকা, [bangla_day], [english_date], [bangla_date]

হিযবুত তাওহীদ নিষিদ্ধ-কাদিয়ানীদের অমুসলিম ঘোষণার দাবি হেফাজত আমিরের

ঈমান বিধ্বংসী ও সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে হিযবুত তাওহীদের কার্যক্রম নিষিদ্ধ এবং কাদিয়ানীদের অমুসলিম হিসেবে রাষ্ট্রীয়ভাবে ঘোষণার দাবি জানিয়েছেন হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের আমির মুহিববুল্লাহ বাবুনগরী। একই সঙ্গে আহলে সুন্নাত ওয়াল জামায়াতের আকিদা-বিশ্বাস সংরক্ষণে জনসচেতনতা তৈরি, লিঙ্গপরিচয় ও ট্রান্সজেন্ডার সংক্রান্ত আইন ও নীতিমালা দেশের ধর্মীয় মূল্যবোধ, সামাজিক বাস্তবতা ও জনমতের আলোকে পর্যালোচনাসহ মওদূদীবাদের মতাদর্শ নিয়েও সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।

মঙ্গলবার (২৫ আগস্ট) রাজধানীর কাকরাইলে ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউটে আয়োজিত জাতীয় উলামা-মাশায়েখ কনভেনশনে পাঠানো লিখিত বক্তব্যে এসব কথা বলেন মুহিববুল্লাহ বাবুনগরী। জাতীয় উলামা-মাশায়েখ কনভেনশনে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত হতে না পারায় তার বক্তব্য পাঠ করে শোনানো হয়।

‘ঈমান-আকিদা সংরক্ষণ কমিটি’ আয়োজিত এ কনভেনশনে আহলে সুন্নাত ওয়াল জামায়াতের আকিদা ও ইসলামের মৌলিক আদর্শ সংরক্ষণের লক্ষ্যে বিভিন্ন দাবি তুলে ধরা হয়। সকাল ১০টায় শুরু হওয়া এ কর্মসূচিতে আমন্ত্রিত বক্তাদের অধিকাংশই হেফাজতে ইসলামের সঙ্গে যুক্ত। এতে বিশেষভাবে ট্রান্সজেন্ডারবান্ধব শ্রম আইন বাতিলের দাবি জানানো হয়।

মুহিববুল্লাহ বাবুনগরী বলেন, বর্তমান সময়ে ঈমান-আকিদা, ধর্মীয় মূল্যবোধ ও সামাজিক স্থিতিশীলতা নানা ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। এ অবস্থায় কোরআন-সুন্নাহর আলোকে সঠিক আকিদা সংরক্ষণ, বিভ্রান্তিকর মতাদর্শ সম্পর্কে জনগণকে সচেতন করা এবং দেশের সামাজিক ও পারিবারিক মূল্যবোধ রক্ষায় ওলামায়ে কেরামের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

কাদিয়ানীদের প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ইসলামের সর্বসম্মত আকিদা হলো হজরত মুহাম্মদ (সা.) মহান আল্লাহর সর্বশেষ নবী ও রাসুল। তার পরে আর কোনো নবী আসবেন না। কাদিয়ানী সম্প্রদায় মির্জা গোলাম আহমদ কাদিয়ানীকে নবী দাবি করে খতমে নবুয়তের মৌলিক আকিদাকে অস্বীকার করেছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।

মুহিববুল্লাহ বাবুনগরী বলেন, ‘এটি কোরআন, সুন্নাহ এবং উম্মতের ইজমার সরাসরি পরিপন্থি। সুতরাং কাদিয়ানীদের অমুসলিম হিসেবে রাষ্ট্রীয়ভাবে ঘোষণা করা এবং সাধারণ মুসলমানদের তাদের ঈমান বিধ্বংসী প্রচারণা থেকে রক্ষা করা সময়ের দাবি।’

মওদূদীবাদের মতাদর্শ নিয়েও সতর্ক থাকার আহ্বান জানান হেফাজতের আমির। তিনি বলেন, ইসলামের সঠিক ভাবমূর্তি ও সালাফে সালেহীনের পথ অক্ষুণ্ন রাখতে মওদূদীবাদের মতাদর্শিক ভুল ও বিভ্রান্তি সম্পর্কে উম্মাহকে সতর্ক থাকতে হবে। আম্বিয়ায়ে কেরামের নিষ্পাপতা, সাহাবায়ে কেরামের মর্যাদা এবং ইসলামের পরিভাষাগুলোর বিকৃত ব্যাখ্যার বিষয়ে আকাবিরে উম্মত যে দিকনির্দেশনা দিয়ে গেছেন, তা অনুসরণ করা জরুরি বলেও উল্লেখ করেন তিনি।

তিনি আরও বলেন, ইসলামি সমাজ বিনির্মাণ হতে হবে কোরআন-সুন্নাহ ও আসলাফের মানহাজ অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তি বিশেষের রাজনৈতিক মনগড়া ব্যাখ্যার ওপর ভিত্তি করে নয়।

হিযবুত তাওহীদের বিষয়ে মুহিববুল্লাহ বাবুনগরী বলেন, সংগঠনটির বিভিন্ন বক্তব্য, প্রচার ও ধর্মীয় ব্যাখ্যা নিয়ে দেশের আলেমসমাজের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরেই গভীর উদ্বেগ রয়েছে। তাদের এমন কিছু মতাদর্শ ও প্রচারণা রয়েছে, যা প্রচলিত ইসলামী আকিদা ও মূলধারার ধর্মীয় বিশ্বাসের সঙ্গে সাংঘর্ষিক এবং সাধারণ মুসলমানদের মধ্যে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করছে বলে তিনি দাবি করেন।

দেশের ধর্মীয় শান্তি, সামাজিক স্থিতিশীলতা এবং আকিদাগত নিরাপত্তার স্বার্থে সরকারের কাছে তাদের কার্যক্রম ও প্রচারণার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করার জন্য জোর দাবি জানান তিনি।

আইন প্রণয়নে দেশের সামাজিক ও ধর্মীয় মূল্যবোধকে গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে হেফাজতের আমির বলেন, বাংলাদেশের সমাজ, সংস্কৃতি, পরিবারব্যবস্থা ও ধর্মীয় মূল্যবোধের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে দেশের আইন প্রণয়ন করা জরুরি। শ্রম আইনসহ যেকোনো আইনে এমন কোনো বিধান থাকা উচিত নয়, যা সংবিধানসম্মত অধিকার, সামাজিক বাস্তবতা, পারিবারিক মূল্যবোধ কিংবা ধর্মীয় অনুভূতির সঙ্গে গুরুতর সংঘাত সৃষ্টি করে।

লিঙ্গপরিচয়, আন্তঃলিঙ্গ ব্যক্তি ও সংশ্লিষ্ট অধিকার নিয়ে যেসব বিধান বা নীতিমালা প্রণয়ন করা হচ্ছে, সেগুলো দেশের আইন, সামাজিক বাস্তবতা, ধর্মীয় মূল্যবোধ ও জনমতের আলোকে যথাযথভাবে পর্যালোচনার আহ্বান জানান তিনি।

তবে একই সঙ্গে কোনো ব্যক্তির প্রতি অন্যায়, বৈষম্য বা অবমাননা যেন না হয়, সেটিও নিশ্চিত করার কথা বলেন মুহিববুল্লাহ বাবুনগরী।

তিনি বলেন, ‘ইসলাম মানুষের মর্যাদা, ন্যায়বিচার এবং অধিকার রক্ষার শিক্ষা দেয়। অতএব, আমাদের অবস্থান হবে নীতিনিষ্ঠ, শান্তিপূর্ণ ও আইনসম্মত; তবে ইসলামের মৌলিক আকিদা, পারিবারিক মূল্যবোধ ও সামাজিক শৃঙ্খলা রক্ষার ব্যাপারে আমরা আমাদের দায়িত্ব থেকে পিছপা হব না।’

সমাজের প্রতিটি স্তরে কোরআন-সুন্নাহর সঠিক শিক্ষা পৌঁছে দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, মসজিদের মিম্বার থেকে শুরু করে সমাজের প্রতিটি স্তরে মানুষকে কোরআন-সুন্নাহর সঠিক শিক্ষা পৌঁছে দিতে হবে। পাশাপাশি বিভ্রান্তিকর মতাদর্শ সম্পর্কে সচেতন করতে হবে এবং জ্ঞান, প্রজ্ঞা ও শান্তিপূর্ণ পদ্ধতিতে জনগণকে পথ দেখাতে হবে।

সম্মেলনের পক্ষ থেকে দেশের সমাজে ঈমান ও আমল শক্তিশালী করা, পরিবারব্যবস্থা সুদৃঢ় করা এবং তরুণ প্রজন্মকে নৈতিক ও আদর্শিকভাবে সমৃদ্ধ করার প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের আমির। একই সঙ্গে দেশে শান্তি, শৃঙ্খলা ও পারস্পরিক সম্মান প্রতিষ্ঠায় ওলামায়ে কেরামের ঐক্য আরও সুদৃঢ় করার আহ্বান জানান তিনি।