ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন দ্য ফেডারেশন অব বাংলাদেশ চেম্বার্স অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (এফবিসিসিআই) নির্বাচনের জৌলুস হারিয়েছে কয়েক বছর ধরে। ভর করেছে নানা অনিয়ম। নানা কেলেঙ্কারিতে জর্জরিত। এখানে সুবিধাভোগীদের উৎপাত বেশি। তা ঘটেছে বেশ কয়েক বছর ধরেই। এ ধারাবাহিকতা ২০২১-২৩ মেয়াদের নির্বাচন ঘিরেও তৈরি হয়েছে। গত ১৩ মার্চ আসোসিয়েশন গ্রুপের ১ হাজার ৯১৩ জন ও চেম্বার গ্রুপে ৪৮৮ জনসহ সর্বমোট ২ হাজার ৪০১ জনের প্রাথমিক
ভোটার তালিকা প্রকাশ হয়। সংশোধনসাপেক্ষে চূড়ান্ত ভোটার তালিকা প্রকাশ হয় ২৪ মার্চ। এ ভোটার তালিকায় ভুয়া ভোটারের ছড়াছড়ি। এ নিয়ে এত দিন কেউ মুখ খোলেননি। সম্প্রতি কিছু ব্যবসায়ী অনিয়ম, অন্যায় সহ্য করতে না পেরে ফুঁসে উঠতে শুরু করেছেন। কেউ কেউ বলেছেন, দেওয়ালে পিঠ ঠেকে গেছে। এ অন্যায়ের প্রতিবাদ করাও দরকার।
২০২১-২৩ মেয়াদের নির্বাচন ঘিরেও ভোটার তালিকায় ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ তুলে ধরেছেন সাধারণ ব্যবসায়ীরা। অভিযোগে বলা হয়, সংগঠনের সঙ্গে সম্পৃক্ত না থাকা ভুয়া লোকদের ভোটার তালিকায় রাখা হয়েছে। সাধারণ ব্যবসায়ীরা ভুয়া ভোটার বাতিলের দাবি জানিয়ে একাধিক লিখিত পত্র দিয়েছেন বলে জানা গেছে। এই ভুয়া ভোটার তৈরি ও সংগঠনগুলো দখলের নেপথ্যে এফবিসিসিআইয়ে শক্তিশালী সিন্ডিকেট রয়েছে। এফবিসিসিআই আপিল বোর্ড বাংলাদেশ মোবাইল ফোন রিচার্জ অ্যান্ড ব্যাংকিং ব্যবসায়ী অ্যাসোসিয়েশন পক্ষে যে ৫ জনকে (৯৭১-৯৭৫) ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করতে বলেছেন সেই সংগঠনের লাইসেন্স বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে নেই, এমনকি এই সংগঠন এফবিসিসিআইয়ের তালিকাভুক্ত সংগঠন নয়। এই ভুয়া পাঁচ ভোটার হচ্ছেন, শফিক ট্রেডিংয়ের মো. শফিকুর রহমান, রুশদা এন্টারপ্রাইজের এইচএম বদরুদদ্দোজা, মেসার্স এ. এ ট্রেডিংয়ের মো. শাহাদাত হোসাইন, মা বেয়ারিং অ্যান্ড মেশিনারিজের মো. শামসুল আলম এবং উসা স্টিল করপোরেশনের রেদওয়ান উদ্দিন সাদ। এরা এফবিসিসিআই ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে কমিটি জমা দেয় বাংলাদেশ মোবাইল ফোন রিচার্জ অ্যান্ড ব্যাংকিং ব্যবসায়ী অ্যাসোসিয়েশন নামে অথচ এফবিসিসিআইয়ে নির্বাচনে ভোটার হয় অন্য সংগঠনের নামে (বাংলাদেশ মোবাইল ফোন রিচার্জ ব্যবসায়ী অ্যাসোসিয়েশন)। এই ভুয়া সংগঠনের পক্ষে আপিল বোর্ড যে রায় দিয়েছে তাতে এফবিসিসিআইয়ের নির্বাচন প্রশ্নবিদ্ধ হলো। কারণ যৌথমূলধন কোম্পানি ও ফার্মসমূহের পরিদপ্তরে বাংলাদেশ মোবাইল ফোন রিচার্জ অ্যান্ড ব্যাংকিং ব্যবসায়ী অ্যাসোসিয়েশন নামে কোনো সংগঠন নিবন্ধন করা নেই, তাহলে ভোটার হয় কীভাবে? মূলত যৌথমূলধন কোম্পানি ও ফার্মসমূহের পরিদপ্তরে নিবন্ধন করা সংগঠন হলো বাংলাদেশ মোবাইল ফোন রিচার্জ ব্যবসায়ী অ্যাসোসিয়েশন যার বৈধ সভাপতি আমিনুল ইসলাম বুলু। প্রতি বছর ক্ষমতার জোর খাটিয়ে এফবিসিসিআই অবৈধ সংগঠনের পক্ষে রায় দেন।
এদিকে গতকাল রোববার বাংলাদেশ মোবাইল ফোন রিচার্জ ব্যবসায়ী অ্যাসোসিয়েশনের মূল সভাপতি আমিনুল ইসলাম বুলু এফবিসিসিআইতে আরবিট্রেশন মামলা দায়ের করেন। আমিনুল ইসলাম বুলু আলোকিত বাংলাদেশকে বলেন, তার বাংলাদেশ মোবাইল ফোন রিচার্জ ব্যবসায়ী অ্যাসোসিয়েশনের নামে এফবিসিসিআইতে পাঁচ ভুয়া ভোটার জমা দিয়ে ভোটার হন। কিন্তু সংগঠনের আসল ব্যক্তিরা ভোটার হতে পারেনি, তা অত্যন্ত দুঃখজনক ও নির্মম। শফিক ট্রেডিংয়ের মো. শফিকুর রহমানকে অনিয়মের কারণে সংগঠন থেকে বহিষ্কার করা হয়, সে এফবিসিসিআইয়ে ভোটার হওয়া প্রশ্নবিদ্ধের শামিল, বলেন তিনি। এফবিসিসিআইয়ের নির্বাচনে জেতার জন্য নেপথ্যে এফবিসিসিআই শক্তিশালী সিন্ডিকেট কাজ করে বলেও মনে করেন আমিনুল ইসলাম বুলু।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, বাংলাদেশ মোবাইল ফোন রিচার্জ ব্যবসায়ী অ্যাসোসিয়েশনের প্রতিষ্ঠাতা মহাসচিব রুশদা এন্টারপ্রাইজের এইচএম বদরুদদ্দোজা আলোকিত বাংলাদেশকে বলেন, ‘আমরা বৈধ ভোটার’ আমিনুল ইসলাম বুলু কীভাবে আমাদের ভুয়া ভোটার বলেন। তিনি তো ভোটারই না।
এইচএম বদরুদদ্দোজা বলেন, এফবিসিসিআই সাবেক সভাপতি আবদুল মাতলুব আহমাদের সময় তিনি বলেন, যেহেতু মোবাইল ফোন রিচার্জের সঙ্গে ব্যাংকিং সংশ্লিষ্টরা জড়িত সেহেতু ব্যাংকিং শব্দটি ব্যবহার করেন। সেই থেকে বাংলাদেশ মোবাইল ফোন রিচার্জ অ্যান্ড ব্যাংকিং ব্যবসায়ী অ্যাসোসিয়েশন নামে আমরা চিঠিপত্র চালিয়ে যাচ্ছি। বাংলাদেশ ব্যাংকে ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে এভাবেই চালিয়ে যাচ্ছি। তবে কিছু কাগজপত্রে কাজ বাকি থাকায় কোথাও কোথাও সাবেক বাংলাদেশ মোবাইল ফোন রিচার্জ ব্যবসায়ী অ্যাসোসিয়েশন লেখা হয়। শফিক ট্রেডিংয়ের মো. শফিকুর রহমানকে ফোন করা হলেও তার সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।
তবে প্রতিবেদকের অনুসন্ধানে দেখা গেছে, এফবিসিসিআইয়ের আগের ভোটার লিস্টে এখনও বাংলাদেশ মোবাইল ফোন রিচার্জ ব্যবসায়ী অ্যাসোসিয়েশন নামে ভোটার ৯৭১-৯৭৫ পর্যন্ত শফিকুর রহমান, এইচএম বদরুদদ্দোজা, শাহাদাত হোসাইন, শামসুল আলম এবং রেদওয়ান উদ্দিন সাদের নাম রয়েছে। তারা সংগঠনের সদস্যপদ বিক্রি করেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশ মোবাইল ফোন রিচার্জ অ্যান্ড ব্যাংকিং ব্যবসায়ী অ্যাসোসিয়েশন নামে ভোটার হওয়ার জন্য এফবিসিসিআই লিখিত চিঠি দেন। সংগঠনের মূল সভাপতি আমিনুল ইসলাম বুলুর অনুমতি বা লিখিত ছাড়া কাউকে তো অন্তর্ভুক্ত করার সুযোগ নেই বলছেন সংশ্লিষ্টরা।
অপরদিকে দেশের শীর্ষ সংগঠনের একাধিক ব্যবসায়ী আলোকিত বাংলাদেশকে জানিয়েছেন, এফবিসিসিআইতে কিছু চেম্বার গ্রুপ বা অ্যাসোসিয়েশন তারা এক সংগঠনের ব্যানারে অন্য ভোটার, এক সংগঠনের সূচনালগ্ন থেকে ক্ষমতা দখল করে আছে। কোনো কোনো সংগঠনের সভাপতি বা সাধারণ সম্পাদকের কাছে তার সংগঠন জিম্মি। আবার কেউ কেউ সংগঠনের নামে বাণিজ্য করে হাতিয়ে নিচ্ছে বিপুল টাকা। এসবই ঘটছে চোখের সমানে। এগুলো দেখার জন্যে এফবিসিসিআইকে কঠোর হস্তে দমন করতেও বলছেন তারা।
জানা গেছে, এফবিসিসিআই ২০২১-২৩ মেয়াদের নির্বাচনে প্রকাশিত ভোটার তালিকায় সংশোধনের রুল জারি করে হাইকোর্ট। ১৯ এপ্রিল ভোটার তালিকা সংশোধনের আবেদন সাত দিনের মধ্যে নিষ্পত্তির নির্দেশ দিয়েছে হাইকোর্ট। একই সঙ্গে আবেদনকারীকে বাদ দিয়ে তৈরি করা ভোটার তালিকা কেন বাতিল করা হবে না, তা জানতে চেয়ে রুল জারি করেছে আদালত। এ বিষয়ে রিট আবেদনের শুনানি নিয়ে ১৯ এপ্রিল সোমবার বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহিম ও বিচারপতি সরদার মো. রাশেদ জাহাঙ্গীরের ভার্চুয়াল হাইকোর্ট বেঞ্চ এ আদেশ দেন। আদালতে রিটের পক্ষে শুনানি করেন আইনজীবী খুরশীদ আলম খান। রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল বিপুল বাগমার।
বাংলাদেশ ফুড স্টাফ ইমপোর্টার অ্যান্ড সাপ্লায়ার অ্যাসোসিয়েশনের সেক্রেটারি আনোয়ার হোসেন বলেন, ‘সম্প্রতি তারা একটি ভোটার তালিকা প্রকাশ করেছে আমাদের ছাড়াই। এ কারণে বাণিজ্য বিধিমালা ১৯৯৪-এর রুলস অনুযায়ী তাদের কাছে আমরা দরখাস্ত দিই। কিন্তু তারা তাতে সাড়া না দেওয়ায় আমরা হাইকোর্টে রিট করি।’
সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, গত কয়েক বছর ধরেই এফবিসিসিআইতে কারসাজি করে মনোনীত পরিচালক করা হয়। সরকারের আস্থাভাজন ব্যবসায়ী প্রথমে মনোনীত সংগঠনের প্রতিনিধি করে সরাসরি পরিচালক পদে মনোনয়ন হন। সেখান থেকে পরে তিনি হন সভাপতি। অর্থাৎ নির্বাচনে অংশ নেওয়ার কোনো ঝুঁকিতেই যেতে হচ্ছে না। এবারও নির্বাচন না হবার সম্ভাবনা রয়েছে। সভাপতির পদে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী না থাকায় সভাপতি নিশ্চিত হওয়া গেছে। সরাসরি নির্বাচন হয় না বলেই সরকারের আস্থাভাজনকে সভাপতি করা এখন অনেক সহজ। এফবিসিসিআইয়ের ৫২ জন পরিচালক থাকেন। তাদের মধ্য থেকেই নির্বাচনের মাধ্যমে নির্বাচিত হন সভাপতি ও দুই সহসভাপতি। এ ৫২ জনের ২০ জনই সরকার মনোনীত সংগঠনের প্রতিনিধি হিসেবে সরাসরি পরিচালক হন। বাকিদের নির্বাচনে জয়ী হতে হয়। সে নির্বাচনও ক্ষীণ।