ঢাকা, শনিবার, ১লা অক্টোবর, ২০২২ খ্রিস্টাব্দ, ১৬ই আশ্বিন, ১৪২৯ বঙ্গাব্দ

ওপারের সংঘাতে এপারে আতঙ্ক

সীমান্তের ওপারে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে গোলাগুলি বন্ধ হয়নি। গতকাল শনিবারও সকাল ৯টা থেকে ওয়ালিডং পাহাড়ে দিনভর থেমে থেমে আর্টিলারি ও মর্টার শেলের গুলির শব্দ শোনা গেছে। এতে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ির ঘুমধুম এবং কক্সবাজারের উখিয়ার পালংখালী সীমান্তে। ভয়ে লোকজন ঘর থেকে বের হচ্ছে না। থমথমে অবস্থা বিরাজ করছে সীমান্তজুড়ে। ঝুঁকি এড়াতে ঘুমধুম উচ্চ বিদ্যালয় কেন্দ্রের এসএসসি পরীক্ষার্থীদের পার্শ্ববর্তী উখিয়া উপজেলায় কুতুুপালং উচ্চ বিদ্যালয় কেন্দ্রে স্থানান্তর করা হয়েছে। গতকাল সকাল ১১টা থেকে ঘুমধুম উচ্চ বিদ্যালয়ের ৪৩৩ জন পরীক্ষার্থী কুতুপালং উচ্চ বিদ্যালয় কেন্দ্রে পৌঁছে বাংলা দ্বিতীয় পত্রের পরীক্ষায় অংশ নেয়।

উদ্ভূত পরিস্থিতিতে মিয়ানমারের ঢাকার রাষ্ট্রদূত উ আং কিয়াউ ময়েকে আজ রোববার তলব করেছে বাংলাদেশ। তাঁকে ডেকে তীব্র প্রতিবাদ জানানোর পাশাপাশি ব্যাখ্যা চাইবে ঢাকা। এর আগেও তিনবার মিয়ানমারের দূতকে তলব করা হয়েছিল। এ নিয়ে এক মাসের মধ্যে চতুর্থবার মিয়ানমারের দূতকে তলব করতে যাচ্ছে বাংলাদেশ। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।

এদিকে, গতকাল ঢাকায় একটি অনুষ্ঠানে স্বরাষ্ট্র্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান বলেছেন, মিয়ানমারের সঙ্গে বাংলাদেশ যুদ্ধ চায় না। বাংলাদেশ আলোচনার মাধ্যমেই সমস্যার সমাধান করতে চায়। শান্তিপূর্ণভাবে সমাধান করতে আমাদের প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকবে। আমাদের পক্ষ থেকে না হয় জাতিসংঘের কাছে তুলব।

এর আগে শুক্রবার রাতে মিয়ানমারের ছোড়া দুটি মর্টার শেল বিস্ম্ফোরণে সীমান্তের কোনারপাড়া নো ম্যান্স ল্যান্ডে নিহত হন রোহিঙ্গা যুবক মোহাম্মদ ইকবাল (১৮)। একই দিন বান্দরবান জেলার নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলার ঘুমধুম-তুমব্রু মিয়ানমার সীমান্তে মাইন বিস্ম্ফোরণে অন্য থাইন চাকমা নামে এক যুবক আহত হন। তিনি তুমব্রু চাকমাপাড়া এলাকার অংকে থাইন চাকমার ছেলে।

বিজিবি সদরদপ্তরের পরিচালক অপারেশন্স লে. কর্নেল ফয়জুর রহমান বলেন, তুমব্রু সীমান্তে মর্টার শেল ছোড়ার ঘটনায় বিজিবি তাৎক্ষণিক মৌখিকভাবে প্রতিবাদ জানিয়েছে। একইভাবে রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে প্রতিবাদ জানানো হয়। পাশাপাশি সীমান্তে বসবাসকারীদের আতঙ্কিত না হতে তাদের বোঝানো হচ্ছে। পাশাপাশি সতর্ক অবস্থানে রয়েছে বিজিবি।

তুমব্রু সীমান্তের শূন্যরেখার আশ্রয়শিবির ব্যবস্থাপনা কমিটির চেয়ারম্যান দিল মোহাম্মদ বলেন, দৃশ্যপট দেখে মনে হচ্ছে, শূন্যরেখার আশ্রয় শিবিরে গুলি ও মর্টার শেল নিক্ষেপের ঘটনা পরিকল্পিত। কারণ, মিয়ানমারের নিরাপত্তা বাহিনী অনেক আগে থেকেই চাইছে নো ম্যান্স ল্যান্ডের আশ্রয়কেন্দ্রের রোহিঙ্গাদের অন্যত্র সরিয়ে দিতে। কিন্তু রোহিঙ্গারা এই আশ্রয়শিবির ছেড়ে কোথাও যেতে রাজি নয়। কারণ এই শিবিরের পেছনে রাখাইন রাজ্যেই রোহিঙ্গাদের বাড়ি। বাড়ি ফিরতে হলে কিংবা বাড়ি ফেরার সুযোগ সৃষ্টি হলে রোহিঙ্গারা এই আশ্রয়শিবির থেকেই হাঁটাপথে বাড়ি ফিরতে ইচ্ছুক।

ঘুমধুম ইউপির চেয়ারম্যান এ কে এম জাহাঙ্গীর আজিজ বলেন, এক মাসের বেশি সময় ধরে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে আরাকান আর্মির সঙ্গে দেশটির নিরাপত্তা বাহিনীর গোলাগুলির ঘটনায় ঘুমধুমের মানুষ আতঙ্কে আছেন। তাঁরা স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারছেন না। দোকানপাট, ব্যবসা-বাণিজ্য প্রায় বন্ধ। সীমান্তে কাউকে যেতে দেওয়া হচ্ছে না।

নাম না প্রকাশ করার শর্তে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা  বলেন, একাধিকবার মিয়ানরমারের দূতকে ডেকে কড়া প্রতিবাদ জানিয়েছে বাংলাদেশ। তাতেও খুব একটা সুফল আসেনি। আবারও তাঁকে ডাকা হবে। দেখা যাক তিনি এর উত্তরে কী বলেন, আর কী ব্যাখ্যা করেন।

এর আগে মিয়ানমারের দূতকে জানানো হয়, এ ধরনের কার্যক্রম বাংলাদেশের শান্তিপ্রিয় মানুষের নিরাপত্তা ও সুরক্ষার জন্য বড় হুমকি। সেই সঙ্গে দুই দেশের সীমান্ত চুক্তির লঙ্ঘন এবং সুপ্রতিবেশীসুলভ আচরণের পরিপন্থি। বৈঠকে মিয়ানমারের অভ্যন্তরে রাখাইনে বাস্তুচ্যুত হওয়া কোনো নাগরিক যাতে সীমান্ত অতিক্রম করে বাংলাদেশে প্রবেশ না করে, সে বিষয়টি নিশ্চিত করতে উ আং কিয়াউ ময়েকে আহ্বান জানানো হয়। এর আগে মর্টার শেল ছোড়ার ঘটনায় মিয়ানমারের দূতকে ৪ সেপ্টেম্বর, ২১ ও ২৮ আগস্ট তলব করা হয়েছিল। এ সময়ে তাঁর হাতে বাংলাদেশের প্রতিবাদপত্র তুলে দেওয়া হয়। এ ছাড়া মিয়ানমারের রেঙ্গুনে বাংলাদেশ দূতাবাসও গুরুত্ব দিয়ে বিষয়টি দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কাছে তুলে ধরেছে।

এদিকে, সীমান্তের ওপারে গোলাগুলির কারণে ঘুমধুম ইউনিয়নের তিনটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রায় দেড় হাজার শিক্ষার্থী নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে পড়লেও শিক্ষা বিভাগের পক্ষ থেকে এখনও কার্যকর কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা ত্রিরতন চাকমা  বলেন, সরকারি নির্দেশনা না আসা পর্যন্ত ঝুঁকিতে থাকা স্কুল বন্ধ ঘোষণা করতে পারি না।

গতকাল এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নেওয়া ঘুমধুম ইউনিয়নের পশ্চিম তুমব্রু এলাকার বাসিন্দা মুজিবুল হকের মেয়ে জান্নাতুল মাওয়া বলেন, ‘সীমান্তের ওপারে জীবনের নিরাপত্তার ভয়ে এবার এসএসসি পরীক্ষা দেওয়া এক প্রকার অনিশ্চিত হয়ে পড়েছিল। পরে প্রশাসনের ত্বরিত সিদ্ধান্তে পার্শ্ববর্তী উখিয়া উপজেলায় গিয়ে পরীক্ষা দেওয়া গেছে। বাসা সীমান্ত সংলগ্ন হওয়ায় অনিশ্চিত জীবনযাপন করতে হচ্ছে।’

 

 

ঘুমধুম পুলিশ ফাঁড়ির পরিদর্শক (ইনচার্জ) সোহাগ রানা বলেন, সকালে ঘুমধুম কেন্দ্রের এসএসসি পরীক্ষার্থীকে পুলিশের পক্ষ থেকে গাড়ি দিয়ে উখিয়ার কুতুপালং কেন্দ্রে পৌঁছানো হয়েছে। অনেকে ব্যক্তিগত উদ্যোগে আগেভাগে কেন্দ্রে পৌঁছেছেন।

পুলিশ কর্মকর্তা আরও বলেন, মিয়ানমার সীমান্তে কারা গোলাগুলি করছে, গোলা এসে কোথায় পড়ছে, সেখানে গিয়ে এসব তথ্য সংগ্রহের সুযোগ পুলিশের নেই। সীমান্ত এলাকায় কাউকে যেতে দেওয়া হচ্ছে না। সেখানে বিজিবি তৎপর রয়েছে।

কক্সবাজারের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (শিক্ষা ও আইসিটি) বিভীষণ কান্তি দাশের নেতৃত্বে গতকাল দুপুরে উখিয়ার পালংখালী সীমান্ত এলাকা পরিদর্শন করেছেন। এ সময় উখিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা, বিজিবি প্রতিনিধি ও স্থানীয় পালংখালী ইউনিয়নের চেয়ারম্যান গফুর উদ্দিন চৌধুরী উপস্থিত ছিলেন।

পালংখালী ইউনিয়নের চেয়ারম্যান গফুর উদ্দিন চৌধুরী বলেন, ‘অতিরিক্ত জেলা প্রশাসকের নেতৃত্বে পরিদর্শনের সময় সীমান্তের ওপারে গোলাগুলি আরও বাড়লে ৭০টি রোহিঙ্গা পরিবারকে অন্যত্র সরিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়।

‘তাদের যুদ্ধ তাদের সীমানায় থাকা উচিত’: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান বলেছেন, আমাদের সীমানায় এসে যে মিয়ানমারের গোলাবারুদ পড়ছে এটার কড়া ভাষায় প্রতিবাদ করছি আমরা। ওদের সঙ্গে কথা হচ্ছে। স্পষ্টভাবে আমাদের অবস্থানের কথা জানিয়েছি। আমাদের প্রধানমন্ত্রী কখনোই যুদ্ধ চান না, আমরা চাই শান্তিপূর্ণ সমাধান। তাদের অভ্যন্তরীণ সংঘাত তাদের সীমানার ভেতরেই থাকুক। গতকাল দুপুরে রাজধানীর ধানমন্ডিতে ঢাকা আহ্‌ছানিয়া মিশন আয়োজিত এক অনুষ্ঠান শেষে সাংবাদিকদের এসব কথা বলেন তিনি।

তিনি আরও বলেন, মিয়ানমার কোনো সময়ই কথা দিয়ে কথা রাখে না। আমরা দ্বিপক্ষীয় ও বহুপক্ষীয় সব চেষ্টা করে যাচ্ছি। আমরা চাই, ১২ লাখ রোহিঙ্গা এখানে আশ্রয় নিয়েছে, শান্তিপূর্ণভাবে তারা যেন প্রত্যাবাসিত হয়।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, সম্প্রতি আমরা দেখছি, মিয়ানমার শুধু রোহিঙ্গা নয়, তাদের অনেক জাতিগোষ্ঠীর সঙ্গে যুদ্ধ চলছে। থাইল্যান্ড, চীন, মিজোরাম এবং আমাদের সীমানা ধরে যুদ্ধ চলছে। আমরা লক্ষ্য করছি, আরাকান আর্মি নামে একটি বিদ্রোহী গোষ্ঠী সেখানে যুদ্ধ করছে। তাদের সঙ্গে কখনও দেখি ভালো ভাব, কখনও দেখি যুদ্ধ। ভেতরে কী রহস্য, সেটা তারাই ভালো জানে। তাদের যুদ্ধ তাদের সীমানায় থাকা উচিত।