ঢাকা, শনিবার, ১লা অক্টোবর, ২০২২ খ্রিস্টাব্দ, ১৬ই আশ্বিন, ১৪২৯ বঙ্গাব্দ

বাংলা ভাষা আন্দোলনে মাতৃভাষাপ্রেমি বঙ্গবন্ধু ডাঃ মোঃ মিজানুর রহমান

আজন্ম বাঙালিসত্তাকে বুকে ধারণ করা জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মনেপ্রাণে, চিন্তাচেতনা সবকিছুতেই ছিলেন একজন খাঁটি বাঙালি। বাংলা ভাষা ও বাঙালি সংস্কৃতিকে বঙ্গবন্ধু আজীবন নিঃস্বার্থ হৃদয়ে ভালোবেসেছেন। কারাগারের রোজনামচায় বঙ্গবন্ধু লিখেন, “অনেকক্ষণ শুয়ে ছোটবেলার কত কাহিনিই না মনে পড়ল। কারণ আমি গ্রামের ছেলে। গ্রামকে আমি ভালোবসি”। নিজের পরিধেয় বস্ত্র সম্পর্কে বলেন, “আমিতো লুঙ্গিই পরি” (ভাষা আন্দোলনে বঙ্গবন্ধু ভূমিকা – হারুন অর রশিদ, পৃষ্ঠা – ৬৬]
আমৃত্যু বাঙালি ও মাতৃভাষাপ্রেমি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাঙালি ও বাংলা ভাষার মর্যাদা রক্ষা ও স্বীকৃতি অর্জনে ছিলেন সর্বদা আপসহীন। ভাষা আন্দোলনের সূচনা পর্ব থেকে পরবর্তীতে বাংলা ভাষার যথাযথ মর্যাদা প্রতিষ্ঠায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ছিল বিশাল অবদান। তিনি আজীবন বাংলা ভাষার উন্নয়ন, বিকাশ ও বাংলা ভাষাবিদদের দাবির কথা বলে গেছেন।
ভাষার লড়াই ও রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ছিল বিশাল অবদান। ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান রাষ্ট্র সৃষ্টির পর পশ্চিমা শাসকগোষ্ঠী বাঙালির কাছ থেকে ভাষার অধিকার হরণ করতে চেয়েছিল। কিন্তু তাদের সেই অপতৎপরতার বিরুদ্ধে গর্জে উঠেছিলেন বাঙালির ত্রাণকর্তা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। বাঙালি স্বাধীনতার স্থপতি এই মহান নেতা ১৯৪৭ সালে ভাষা আন্দোলনের সূচনা পর্বে, ১৯৪৮ সালে রাজপথে আন্দোলন ও কারাবরণ, পরে আইনসভার সদস্য হিসেবে রাষ্ট্রভাষার সংগ্রাম ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠায় অতুলনীয় ভূমিকা রাখেন।
১৯৪৭ সালর ৬-৭ সেপ্টেম্বর ঢাকায় পূর্ব পাকিস্তান কর্মী সম্মেলন আহ্বান করা হলো। সম্মেলন চলাকালীন ৭ সেপ্টেম্বর জন্ম নিলো অসম্প্রদায়িক পূর্ব পাকিস্তান গণতান্ত্রিক যুবলীগ। সম্মেলনে প্রস্তাবগুলো পাঠ করলেন সেদিনের তরুণ ছাত্রনেতা বাঙালির স্বাধীনতার স্বপ্নদ্রষ্টা জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।
গাজীউল হক লিখেন, “ভাষা সম্পর্কিত প্রস্তাব উত্থাপন করে তিনি বললেন, ‘পূর্ব পাকিস্তান কর্মী সম্মেলন প্রস্তাব করিতেছে যে, বাংলা ভাষাকে পূর্ব পাকিস্তানের লিখার বাহন ও আইন আদালতের ভাষা করা হউক। সমগ্র পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা কী হইবে। সে সম্পর্কে আলাপ-আলোচনা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের ভার জনসাধারণের উপর ছাড়িয়া দেওয়া হউক। এবং জনগণের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত বলিয়া গৃহীত হউক’। এভাবেই ভাষার দাবি প্রথমে উচ্চারিত হয়েছিল। উচ্চারিত হয়েছিল নিজের মাতৃভাষায় বিনা খরচে বাধ্যতামূলক প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা পাওয়ার মৌলিক অধিকারের দাবি। জাতীয় এবং সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে শিক্ষাব্যবস্থা প্রবর্তন করার দাবি।”
১৯৪৭ সালের ১ সেপ্টেম্বর তমুদ্দন মজলিশ গঠিত হয় এবং বাংলাকে রাষ্ট্র ভাষা করার দাবিতে সক্রিয় ভূমিকা গ্রহণ করে। ভাষা আন্দোলনের শুরুতে তমুদ্দন মজলিসের রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন সংক্রান্ত কার্যক্রমে বঙ্গবন্ধু অংশগ্রহণ করেন। অধ্যাপক ড. মযহারুল ইসলাম এ প্রসঙ্গে বলেন, ‘শেখ মুজিবুর রহমান এই মজলিসকে রাষ্ট্রভাষা সংক্রান্ত বহুকাজে সাহায্য ও সমর্থন করেন’ (সূত্র : বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব, কৃত- মযহারুল ইসলাম : ঢাকা, আগামী প্রকাশনী, ১৯৯৩ : পৃ. ১০৪)

১৯৪৭ সালের ডিসেম্বরে ভাষা আন্দোলনসহ অন্যান্য দাবি নিয়ে ‘রাষ্ট্র্রভাষা-২১ দফা ইস্তেহার- ঐতিহাসিক দলিল’ নামে একটি পুস্তিকা প্রকাশিত হয়। এই ইস্তেহার প্রণয়নে শেখ মুজিবুর রহমানের অবদান ছিল অনস্বীকার্য এবং তিনি ছিলেন অন্যতম স্বাক্ষরদাতা। এ প্রসঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের অধ্যাপক ড. সৈয়দ আনোয়ার হোসেন বলেন, ‘পাকিস্তান সৃষ্টির তিন-চার মাসের মধ্যেই পুস্তিকাটির প্রকাশনা ও প্রচার তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের অধিবাসীদের জন্য পাকিস্তান নামের স্বপ্ন সম্পৃক্ত মোহভঙ্গের সূচনার প্রমাণ বহন করে। পুস্তিকাটি যাদের নামে প্রচারিত হয়েছিল তারা সবাই অতীতে ছিলেন পাকিস্তান আন্দোলনে সম্পৃক্ত নিবেদিত প্রাণ কর্মী। উল্লেখ্য, এদেরই একজন ছিলেন ফরিদপুরের (বর্তমানে গোপালগঞ্জ) শেখ মুজিবুর রহমান; পরবর্তীকালে যিনি বঙ্গবন্ধু হিসেবে বাংলাদেশ সৃষ্টিতে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন।”
১৯৪৮ সালের ৪ জানুয়ারি গঠিত হয় পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগ। ভাষা আন্দোলনের ইতিহাসে এই সংগঠনটির ভূমিকা খুবই স্মরণীয়। ১৯৪৮ সালের ৪ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠিত ছাত্রলীগের ১০ দফা দাবির মধ্যে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা বাংলা করার ও সামরিক বাহিনীতে বাঙালিদের নিয়োগ এবং বাধ্যতামূলক সামরিক শিক্ষার দাবি ছিল অন্যতম দাবি।
১৯৪৮ সাল ছিলো ভাষা আন্দোলনের আদিপর্ব। বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা বলেন, “ ১৯৪৮ সালের ১১ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র শেখ মুজিব তিনিই শুরু করেছিলেন এই আন্দোলন। আমরা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে বাংলাভাষা, মায়ের ভাষা, সেই মাতৃভাষায় কথা বলার সুযোগ পেয়েছি। মাতৃভাষা রাষ্ট্রীয় মর্যাদা পেয়েছে।’
১৯৪৮ সালের ১১ মার্চ ভাষা আন্দোলনের ইতিহাসে এক অনন্য অবিস্মরণীয় দিন। এই দিনে রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে সর্বাত্মক সাধারণ ধর্মঘট পালিত হয়। এটাই ছিল ভাষা আন্দোলনের ইতিহাসে তথা পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর এ দেশে প্রথম সফল হরতাল। এই হরতালে শেখ সাহেব নেতৃত্ব প্রদান করেন এবং পুলিশি নির্যাতনের শিকার হয়ে গ্রেপ্তার হন। ভাষাসৈনিক অলি আহাদ তাঁর ‘জাতীয় রাজনীতি ১৯৪৫ থেকে ১৯৭৫’ গ্রন্থে লিখেছেন, ‘আন্দোলনে অংশগ্রহণ করার নিমিত্তে শেখ মুজিবুর রহমান গোপালগঞ্জ হতে ১০ মার্চ ঢাকায় আসেন।’ ১১ মার্চের হরতাল কর্মসূচিতে যুবক শেখ মুজিব এতটাই উৎসাহিত হয়েছিলেন যে, এ হরতাল ও কর্মসূচি তার জীবনের গতিধারা নতুনভাবে প্রবাহিত করে। মোনায়েম সরকার সম্পাদিত বাংলা একাডেমি কর্তৃক প্রকাশিত ‘বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান : জীবন ও রাজনীতি’ শীর্ষক গ্রন্থে বলা হয়েছে, ‘স্বাধীন পাকিস্তানের রাজনীতিতে এটিই তাঁর প্রথম গ্রেপ্তার।’
বঙ্গবন্ধু লিখেছেন, “ যে পাঁচ দিন আমরা জেলে, সকাল দশটায় মেয়েরা স্কুলের ছাদে উঠে স্লোগান দিতে শুরু করতো, আর চারটায় শেষ করতো। ছোট্ট ছোট্ট মেয়েরা একটুও ক্লান্ত হতো না। ‘রাষ্ট্র ভাষা বাংলা চাই’, ‘বন্দি ভাইদের মুক্তি চাই’, ”পুলিশি জুলুম চলবে না’ – নানা ধরনের স্লোগান দিতো। এই সময় শামসুল হক সাবেককে আমি বললাম, “হক সাহেব ঐ দেখুন, আমাদের বোনেরা বেরিয়ে এসেছে। আর বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা না করে পারবে না।” হক সাহেব আমাকে বললেন, “তুমি ঠিকই বলেছো, মুজিব।”
শেখ মুজিবুর রহমানের গ্রেফতারের প্রতিবাদে গোপালগঞ্জে দুটি স্কুলের প্রায় ৪০০ ছাত্র ক্লাস ত্যাগ করে রাস্তায় প্রতিবাদ মিছিল করে স্লোগান দেয়, “পাকিস্তান জিন্দাবাদ, ছাত্রদের দাবি মানতে হবে, রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই, নাজিমউদ্দিন নিপাত যাক, মুজিবের মুক্তি চাই, ছাত্র বন্দিদের মুক্তি চাই।”
মার্চের ৩ তারিখ বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে একটা প্রচারপত্র প্রকাশিত হয় যেখানে শেখ মুজিবুর রহমানের সাক্ষর ছিলো। [ বঙ্গবন্ধু সমগ্র, মুনতাসীর মামুন, পৃ- ৫৬,৫৭]
১৫০নং মোগলটুলীর ‘ওয়ার্কাস ক্যাম্প’ ছিল যেখানে ভাষা আন্দোলনের সপক্ষের কর্মীবাহিনী এখানে নিয়মিত জমায়েত হত এবং বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার নানা কর্ম পরিকল্পনা এখানেই নেয়া হতো। শেখ মুজিব, শওকত আলী, কামরুদ্দিন আহমদ প্রমুখ নেতৃবৃন্দ ছিলেন এই ক্যাম্পের প্রাণশক্তি। বাহাউদ্দিন চৌধুরী বলেন, ‘সাতচল্লিশে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পরও ১৫০ মোগলটুলী বিরোধী রাজনীতির সূতিকাগার হিসেবে দায়িত্ব পালন করে। কলকাতা থেকে শেখ মুজিবুর রহমান, জহিরুদ্দিন, নঈমুদ্দিনের মতো নেতারা প্রথমে ১৫০ মোগলটুলীতেই জমায়েত হন।’ (সূত্র : ১৫০ মোগলটুলী- বাহাউদ্দীন চৌধুরী, জনকণ্ঠ ঈদসংখ্যা-২০০৮)।
১৯৪৯ সালের ৮ জানুয়ারি পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগ সমগ্র পূর্ব বাংলার শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে জেল জুলুম নির্যাত ও পুলিশি আচরণের বিরুদ্ধে “জুলুম বিরোধী দিবস” পালন করে। এ উপলক্ষে ছাত্রলীগ কতৃক গঠিত কমিটির প্রধান ছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। একই বছর ২৩ জুন পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম লীগ প্রতিষ্ঠা হলে কারাবন্দী অবস্থায় থাকা বঙ্গবন্ধুকে যুগ্ম সম্পাদক নির্বাচিত করা হয়। ১৯৪৯ সালের ৩১ ডিসেম্বর গ্রেফতার হওয়ার পর একটানা ২৬ মাস বঙ্গবন্ধুকে কারাগারে কাটাতে হয়। ২৭ ফেব্রুয়ারি ১৯৫২ সালে বঙ্গবন্ধু মুক্তি পান। দলের সভাপতি মাওলানা ভাষানী কারাগারে এবং সাধারণ সম্পাদক শামসুল হকের মারাত্মক স্বাস্থ্যের অবনতি ঘটায়, এমনই পরিস্থিতিতে দলের সিদ্ধান্তে ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব বর্তায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের উপর। বস্তুত বঙ্গবন্ধুকেই দলের সব দায়িত্ব পালন করতে হয়। সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্বভার গ্রহণের দিন অর্থাৎ ২৭ এপ্রিল ঢাকা জেলা বার লাইব্রেরিতে ১৬টি জেলার প্রায় ৫০০ প্রতিনিদির উপস্থিতিতে অনুষ্ঠিত সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের সম্মেলনে যোক দিয়ে বঙ্গবন্ধু তার বক্তব্যে বাংলাকে যে কোনো মূল্যে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার অঙ্গিকার ব্যক্ত করেন। তিনি সরকারকে চ্যালেন্জ ছুড়ে দিয়ে বলেন, প্রয়োজনে এ প্রশ্নে বাংলার রেফারেন্ডাম আয়োজন করে দেখা যেতে পারে। [ভাষা আন্দোলনের বঙ্গবন্ধুর অবদান, হারুন অর রশিদ, পৃষ্ঠা- ৮৮]
রাষ্ট্রভাষা প্রশ্নে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর অবস্থান পরিবর্তনেও বঙ্গবন্ধু ভূমিকা রেখেছিলেন। রাষ্ট্রভাষার প্রশ্নে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর অবস্থান ও চিন্তাভাবনা ছিলো ভিন্ন। তিনি মনে করেন, “এ বিতর্ক বন্ধ না হলে পাকিস্তানের সংহতি বিনষ্ট হতে পারে।” কিন্তু ভাষার প্রশ্নর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ছিলেন আপসহীন। ২৯শে এপ্রিল ঢাকায় বিবৃতিতে পাকিস্তানের কারাগারে নিরাপত্তা বন্দীদের শোচনীয় অবস্থা বর্ণনা করতে গিয়ে স্পষ্ট ভাষায় ঘোষণা দেন, “এ (ভাষা) আন্দোলনে যারা শহীদ হইয়াছেন এবং অন্যান্য যাহারা অত্যাচারিত ও কারারুদ্ধ হইয়াছেন, তাদের ত্যাগস্বীকার বৃথা হইবে না। মুসলিম লীগ ও মুসলিম সরকার যতই না কেন চক্রান্ত করুক বাংলাকে আমরা অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করিবই।” মে মাসের বঙ্গবন্ধু করাচিতে গিয়ে গভর্নর জেনারেল গোলাম মোহাম্মদ ও প্রধানমন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দিনের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে ভাষা আন্দোলনে গ্রেপ্তারকৃতদের মুক্তির দাবিতে স্মারকলিপি পেশ করেন। বঙ্গবন্ধু তার সাংগঠনিক সফর কালে অনুষ্ঠিত প্রতিটি জনসভায় বাংলাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার দাবি তুলে ধরেন।
[ভাষা আন্দোলনের বঙ্গবন্ধুর অবদান, হারুন অর রশিদ, পৃষ্ঠা- ৮৯]
১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি বাংলা মায়ের দামাল ছেলেদের বুকের রক্তে সেদিন রাজপথ রঞ্জিত হয়েছিল। রফিক, সালাম, বরকত, শফিউরসহ নাম না জানা অসংখ্য শহীদের রক্তস্নাত এই অর্জন বিশ্বে বাঙালিকে অমর করে রেখেছে। ভাষা আন্দোলনের পথ ধরেই আমরা পৃথিবীর বুকে পেয়েছি লাল সবুজের স্বাধীন রাষ্ট্র বাংলাদেশ।
বাংলাদেশের স্বাধীনতা লাভের মূল নায়ক ও স্থপতি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বলেছেন, “বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব ভাষা আন্দোলনেরই সুদুর প্রসারী ফলশ্রুতি” (দৈনিক সংবাদ, ২১ ফেব্রুয়ারি, ১৯৭৫)।
১৯৫২ সালে ভাষা আন্দোলনের বিস্ফোরণ পর্বে শেখ সাহেব জেলে ছিলেন। ব্যক্তিগতভাবে রাজনৈতিক ময়দানে অনুপস্থিত থাকলেও জেলে বসেও নিয়মিত আন্দোলনকারীদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতেন এবং প্রয়োজনীয় নির্দেশ প্রদান করতেন।
ভাষাসৈনিক, প্রখ্যাত সাংবাদিক আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী ‘একুশকে নিয়ে কিছু স্মৃতি, কিছু কথা’ প্রবন্ধে বলেছেন : শেখ মুজিব ১৯৫২ সালের ফেব্রুয়ারি মাসের ১৬ তারিখ ফরিদপুর জেলে যাওয়ার আগে ও পরে ছাত্রলীগের একাধিক নেতার কাছে চিরকুট পাঠিয়েছেন।”
বঙ্গবন্ধুর পাশাপাশি রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনে যাদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল তারা সকলেই একবাক্যে স্বীকার করেছেন যে, বঙ্গবন্ধু জেলখানা থেকে এবং পরে হাসপাতালে থাকাকালীন আন্দোলন সম্পর্কে চিরকুটের মাধ্যমে নির্দেশ পাঠাতেন।
গাজীউল হক লিখেছেন, ‘১৯৪৯ সালের অক্টোবর মাসে গ্রেপ্তার হওয়ার পর জনাব শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৫২ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত বিভিন্ন জেলে আটক ছিলেন। ফলে স্বাভাবিক কারণেই ’৫২ সালে ভাষা আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করা জনাব শেখ মুজিবুর রহমানের পক্ষে সম্ভব ছিল না। তবে জেলে থেকেই তিনি আন্দোলনের নেতৃবৃন্দের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করে চলতেন এবং বিভিন্ন বিষয়ে পরামর্শ দিতেন।’ (আমার দেখা আমার লেখা, পৃষ্ঠা-৪০)।
১৯৫৩ সালে একুশের প্রথম বার্ষিকী পালনেও বঙ্গবন্ধুর যথেষ্ট ভূমিকা ছিল। বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে ঢাকা বিশ্বিবদ্যালয়ের ক্যাম্পাস থেকে কালো পতাকা মিছিল ও বিভিন্ন স্লোগান সম্মিলিত ফেস্টুন, প্লাকার্ডসহ ছাত্রদের একটি মিছিল বের হলে তাতে সাধারণ জনগণ এসে যোগ দেয়। মিছিলটি ঢাকার বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ করে। সে দিন সব আন্দোলন, মিছিল এবং নেতৃত্বের পুরোভাগে ছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। আরমানিটোলা ময়দানে অনুষ্ঠিত জনসভায় তিনি সেদিন একুশে ফেব্রুয়ারিকে শহীদ দিবস হিসেবে ঘোষণা দেয়ার আহ্বান জানান এবং অবিলম্বে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবি জানান।
১৯৭১ সালে বাংলা একাডেমিতে একটি সভায় বক্তৃতা দিতে গিয়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বলেন, “ভাষা-আন্দোলনের শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করে আমি ঘোষণা করছি, আমার দল ক্ষতা গ্রহণের দিন থেকেই সকল সরকারি অফিস আদালত ও জাতীয় জীবনের অন্যান্য ক্ষেত্রে বাংলা চালু হবে। এ ব্যাপারে আমরা পরিভাষা সৃষ্টির জন্য অপেক্ষা করব না। কারণ তাহলে সর্বক্ষেত্রে কোনোদিনই বাংলা চালু করা সম্ভবপর হবে না। এ অবস্থায় হয়তো কিছু কিছু ভুল হবে কিন্তু তাতে কিছু যায় আসে না, এভাবেই অগ্রসর হতে হবে।” (সূত্র : দৈনিক পাকিস্তান, ১৬ ফেব্রুয়ারি ১৯৭১)
১৯৭৪ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর সালে জাতিসংঘে বাংলাভাষায় ভাষণ দিয়ে যে ঐতিহাসিক ভূমিকা পালন করেছেন, তা ইতিহাসের পাতায় চিরদিন স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। বঙ্গবন্ধু বলেন, “সাড়ে সাত মিলিয়ন জনসংখ্যার রাষ্ট্রভাষা যদি আন্তর্জাতিক ভাষা হতে পারে আমার ৭৫ মিলিয়ন (১৯৭৪ সালে ) মানুষের বাংলাভাষা কেন আন্তর্জাতিক ভাষা হবেনা।”
রাষ্ট্রপতি থাকাকালীন ১৯৭৫ সালের ১২ মার্চ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান অফিসের কাজে বাংলাভাষা প্রচলনের প্রথম সরকারি নির্দেশ জারি করেন। রাষ্ট্রপতি কর্তৃক জারিকৃত এক আদেশে বলা হয়, “গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের রাষ্ট্রভাষা বাংলা। বাংলা আমাদের জাতীয় ভাষা। তবুও অত্যন্ত দুঃখের সঙ্গে লক্ষ্য করছি যে, স্বাধীনতার তিন বছর পরও অধিকাংশ অফিস আদালতে মাতৃভাষার পরিবর্তে বিজাতীয় ইংরেজি ভাষায় নথিপত্র লেখা হচ্ছে। মাতৃভাষার প্রতি যার ভালোবাসা নেই, দেশের প্রতি যে তাঁর ভালোবাসা আছে এ কথা বিশ্বাস করতে কষ্ট হয়। দীর্ঘ তিন বছর অপেক্ষার পরও বাংলাদেশের বাঙালি কর্মচারীরা ইংরেজি ভাষায় নথি লিখবেন সেটা অসহনীয়। এ সম্পর্কে আমার পূর্ববর্তী নির্দেশ সত্ত্বেও এ ধরনের অনিয়ম চলছে। আর এ উচ্ছৃঙ্খলতা চলতে দেয়া যেতে পারে না।” (সূত্র : রাষ্ট্রপতির সচিবালয়, গণভবন, ঢাকা, পত্রসংখ্যা- ৩০/১২/৭৫-সাধারণ-৭২৯/৯(৪০০) তারিখ : ১২ মার্চ ১৯৭৫)
বঙ্গবন্ধু একবার লোকসংগীত শিল্পী আব্বাসউদ্দিনের সাথে নৌকায় সফর করার সময় আব্বাসউদ্দিনের কন্ঠে ভাটিয়ালি গান শুনে বঙ্গবন্ধু এতই মুগ্ধ হন যে, পরবর্তীতে বঙ্গবন্ধু তার অনুভূতি প্রকাশ করে বলেন, “নদীতে বসে আব্বাস সাহেবের গান তার নিজের গলায় না শুনলে জীবনে একটা অপূর্ণতা থেকে যেত। তিনি যখন গাইছিলেন তখন মনে হচ্ছিল, নদীর ঢেউগুলো যেন তার গান শুনছে।” [ভাষার লড়াইয়ে বঙ্গবন্ধু ভূমিকা, হারুন অর রশীদ ]
বঙ্গবন্ধু লেখেন, “আমি আব্বাসউদ্দিন সাহেবের একজন ভক্ত হয়ে পড়েছিলাম। তিনি আমাকে বলেছিলেন, “মুজিব, বাংলা ভাষার বিরুদ্ধে বিরাট যড়যন্ত্র চলছে। বাংলা রাষ্ট্রভাষা না হলে বাংলার কৃষ্টি, সভ্যতা সব শেষ হয়ে যাবে। আজ যে গানকে তুমি ভালোবাস, এর মাধুর্য ও মর্যাদাও নষ্ট হয়ে যাবে। যা কিছু হোক, বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করতেই হবে।’ আমি কথা দিয়েছিলাম এবং কথা রাখতে চেষ্টা করেছিলাম।” [ বঙ্গবন্ধু সমগ্র, মুনতাসীর মামুন ]
বঙ্গবন্ধু তার কথা রেখেছিলেন, জাতির জনক হিসেবে যখন স্বাধীন বাংলাদেশে তিনি সংবিধান পাশ করেন তখন তৃতীয় অনুচ্ছেদে একটি বাক্য ছিলো, “প্রজাতন্ত্রের রাষ্টভাষা হইবে বাংলা।”

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ভাষায় জন্য লড়াই করেছিলেন, আজীবন বাংলা ভাষার চেতনাকে বুকে ধারণ করে গেছেন। ভাষার লড়াইয়ে আমৃত্যু ছিলেন আপসহীন। বঙ্গবন্ধুর বাঙালিসত্তা ও মাতৃভাষাপ্রেমির চেতনা বুকে ধারণ করার কারণেই এই মহান নেতা আমাদের এনে দিতে পেরেছিলেন পৃথিবীর বুকে একটি স্বাধীনতা রাষ্ট্র বাংলাদেশ আর বাংলা ভাষাকে সঠিক মর্যাদা দিয়ে বাংলাকে করেছিলেন সেই স্বাধীন রাষ্ট্রের “রাষ্ট্রভাষা”৷ বাঙালি জাতি বঙ্গবন্ধুর এই অনন্য সাধারণ ভূমিকার কথা কখনাে ভুলবে না।

লেখক পরিচিতঃ
ডাঃ মোঃ মিজানুর রহমান
চিকিৎসক ও কলামিস্ট