ঢাকা, রবিবার, ২০শে জুন, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ, ৬ই আষাঢ়, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ

একটানা ৯ দিন উড়তে পারা পরিযায়ী পাখি ‘কালালেজ-জৌরালি’

মৌলভীবাজার: বিস্ময়কর এক পরিযায়ী পাখি ‘কালালেজ-জৌরালি’। যারা একনাগারে কোনো কিছু না খেয়ে কয়েকদিন পৃথিবীর একপ্রান্ত থেকে অন্যপ্রান্তে উড়ে যেতে পারে।পাখিটির শরীরে ট্রান্সমিটার বসিয়ে বিজ্ঞানীরা এ সত্যতার প্রমাণ পেয়েছেন। প্রতি বছর শীতে মৌলভীবাজারের বাইক্কা বিলে ওরা ঝাঁকে ঝাঁকে আসে। বিলের কাদার ভেতর থেকে পোকা-কীট বের করে খেয়ে জীবনধারণ করে।
দিবারাত্রী বিরামহীন উড্ডনশীল এ বিস্ময়কর পরিযায়ী পাখিটির নাম ‘কালালেজ-জৌরালি’। ইংরেজি নাম Black-tailed Godwit এবং বৈজ্ঞানিক নাম Limosa limosa। এদের শরীর ৪৪ সেন্টিমিটার। বাদামি দেহ এবং পিঠে বাদামি আইশের দাগ। পুরুষের চেয়ে স্ত্রী পাখিটি সামান্য বড়।

প্রখ্যাত পাখি বিশেষজ্ঞ এবং বাংলাদেশ বার্ড ক্লাবের প্রতিষ্ঠাতা ইনাম আল হক বাংলানিউজকে বলেন, ব্লেকটেইল-গডউইথ এই পাখিটা গত কয়েক বছর ধরে প্রায় বিপন্ন হয়ে আসছে। আগে অনেক হাজার হাজার সংখ্যা দেখা যেতো। এখনো সংখ্যাটা বাংলাদেশে হাজারই আছে কিন্তু পৃথিবীতে খুব কমে গেছে। এই পৃথিবীর একমাত্র পাখি যাদের শরীরে অদ্ভুত শক্তি আছে।

তিনি আরো বলেন, এই পাখিটার একটা বিশেষত্ব হলো, পুরো শীতজুড়ে বাংলাদেশে থাকে। এছাড়াও মালয়েশিয়া, অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ডেও চলে যায়। শীতের ওর হিমালয় পার হয়ে উত্তরে যেয়ে তুন্দ্রা অঞ্চলে বাসা করে। ওরা এখানে এখন বাসা করছে। মাটিতে বাসা করে ডিম পড়বে, ছানা তুলবে। আবার অক্টোবর-নভেম্বর মাসে বাংলাদেশে চলে আসবে। এরা কাদা থেকে পোকা টেনে বের করে খায়। যার জন্য এদের চঞ্চু (ঠোঁট) এবং পা অনেক লম্বা। ফলে প্রায় এক ফুট গভীর পানিতেও সে অনায়াসে হেঁটে বেড়াতে পারে।এ পাখিটির দিবারাত্রী বিরামহীন উড্ডনশীল ক্ষমতা কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, এই পাখিটা সম্পর্কে একটা নতুন তথ্য জানা গেছে, এই পাখিটা পৃথিবীর এখন পর্যন্ত একমাত্র পাখি যারা ৯ দিন ৯ রাত এক টানা উড়ে যেতে পারে। কোথাও না থেমে, না ঘুমিয়ে, না খেয়ে শুধুই উড়তে পারে। ওরা পরিযায়ন করে তুন্দ্র অঞ্চলে একটানা উড়ে আসে পারে। তাদের কেউ কেউ আবার একেবারে অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ডে চলে যায়। এটা এখনো ব্যাখ্যা করা যায় না যে, কিভাবে ওরা এটা করে? তাদের শরীরে ট্রান্সমিটার লাগলে নিশ্চিতভাবে জানা গেছে যে, ওরা প্রতিবছর একাটানা কোনও না থেমে এভাবে পরিযায়নের কাজটি করছে। তার অর্থ, আমরা বাংলাদেশে যেসব ব্লেকটেইল-গডউইথ (কালালেজ-জৌরালি) পাখিদের দেখতে পাই তারা একনাগারে ৯ দিন উড়ে এসে বাংলাদেশের বিলগুলোতে নেমেছে। কোথাও থেমে থেমে আসেনি, যে রকম অন্য পরিযায়ী পাখিরা আসে। আমি চলতি বছরের মার্চ মাসে বাইক্কা বিলে তাদেরকে অনেক দেখেছি।

উড্ডনের বিষয়টি আরো ব্যাখ্যা করে বলেন, এক নাগারে ৮/৯ দিন উড়ে যাওয়ার ক্ষমতায় তার শরীরের শক্তি অর্থাৎ শরীরের পানি তো কঠিন পরিশ্রমের ফলে শেষ হয়ে যাওয়ার কথা। এই দীর্ঘ পরিযায়নে ওদের ঘুমানো কি ব্যবস্থা তাও জানা নেই। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো-কি করে ৯দিন, ৯ রাত্রি তারা উড়ে যাচ্ছে, কিন্তু আকাশের কোথাও পানি খাচ্ছে না। কিভাবে তার শরীর এটা করতে পারে– এটা বিজ্ঞানের জন্যে একটা বিস্ময় এবং অদ্যাবধি অজানা বিষয়। অন্যপাখিদের মধ্যে এমন একটি বিশেষ ধরণের ক্ষমতার কথা এখনো জানা যায়নি।সংখ্যার কথা উল্লেখ করে ইনাম আল হক বলেন, এই পাখিটির সংখ্যাও এখন অনেক কমে যাচ্ছে। এই বিশিষ্ট পাখিটিকে সংরক্ষণের জন্য উদ্যোগ নিতে হবে। এ ধরনের একটি পাখি প্রজাতি পৃথিবী থেকে শেষ হয়ে যাক এটা আমরা কখনোই চাই না। এটি পাখিটিকে আন্তর্জাতিকভাবে সংরক্ষণের জন্য বাংলাদেশকে বড় ভূমিকা রাখতে হবে। এ পাখিগুলোর খুব বড় একটা অংশ আমাদের উপকূলে এবং হাওরের বিলগুলোকে তারা ৫/৬ মাস কাটিয়ে যায়। ওদের বিচরণকরা জায়গাগুলোকে সংরক্ষিত করতে হবে। বৃহত্তর সিলেটে বিভাগের মাঝে বাইক্কা বিল, টাংগুয়ার হাওর সংরক্ষিত এলাকা। হাকালুকি হাওরের কিছু বিল সংরক্ষিত ঘোষণা থাকলেও যদিও বাস্তবতার ভিত্তিতে সংরক্ষিত নয়। অনেকগুলো বিলকে সংরক্ষণের ঘোষণাও করা হয়েছে। এই ধরণের উদ্যোগ আরো নিতে হবে।

শুধু ঘোষণা, কাগজ বা কথায় নয়, কাজেও সংরক্ষণনীতিমালার বাস্তবায়ন ঘটাতে হবে। যেন ওই সংরক্ষিত জায়গাগুলোতে আমিও যখন খুশি তখন না যেতে পারি। অন্য লোক তো নয়ই, যেতে গেলে আমাকে বলতে হবে কেন আমি ওখান যাচ্ছি। যত মানুষ যাবে পাখিগুলো তার পরিবেশ হারাবে, খাবার হারাবে, মানুষ তাদের দূষণ ওখানে নিয়ে যাবো, ওরা নিরাপদ থাকতে পারবে না। ফলে সংরক্ষণ মানেই যে হ্যাবিটেড সব জায়গাগুলোতে মানুষের আনাগোনা সম্পূর্ণভাবে বন্ধ নয়, সীমিত করতে হবে বলে পরামর্শ দেন প্রখ্যাত পাখি বিজ্ঞানী ইনাম আল হক।