ঢাকা, সোমবার, ১২ই এপ্রিল, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ, ২৯শে চৈত্র, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ

ফের গবেষণায় চৌর্যবৃত্তির অভিযোগ ঢাবির ২ শিক্ষকের বিরুদ্ধে

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়: গবেষণা প্রতিবেদনে কুম্ভিলকবৃত্তি (চুরি, অন্যের লেখা নিজের বলে চালানো) করায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) দুই শিক্ষকের চূড়ান্ত প্রতিবেদন গ্রহণ না করে প্রকল্প বাতিল করেছে বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটি। একইসঙ্গে গবেষক হিসেবে তাদের এশিয়াটিক সোসাইটিতে কালো তালিকাভুক্তির সুপারিশ করা হয়েছে।

অভিযুক্ত দুই শিক্ষক হলেন- ইতিহাস বিভাগের অধ্যাপক ড. ঈশানী চক্রবর্তী ও নৃবিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. জোবায়দা নাসরীন।

বাংলানিউজের পক্ষ থেকে সংগ্রহ করা গবেষণা প্রতিবেদনটি বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ‘বৃহত্তর ঢাকার স্থানিক সংস্কৃতি ও বৈশিষ্ট্যের স্বরূপ অনুসন্ধান’ শিরোনামে গবেষণার চূড়ান্ত প্রতিবেদনটিতে ছয়টি অধ্যায় রয়েছে। সূচিপত্রে তাজিয়া মিছিলকে লেখা হয়েছে তাকিয়া মিছিল। দ্বিতীয় অধ্যায়ে বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক শামসুজ্জামান খানের অভিমত দেওয়া হলেও কোনো ধরনের রেফারেন্স উল্লেখ করা হয়নি। ধর্মীয় উৎসব বর্ণনায় ঈদুল ফিতর, ঈদুল আজহা, মহররম, দুর্গাপূজা, হালখাতার বর্ণনার ৬-১৬ নম্বর পৃষ্ঠার বিবরণের অধিকাংশই বাংলাপিডিয়া থেকে হুবহু তুলে ধরা হয়েছে।

শুরু থেকে ইউনিকোডে লেখা হলেও তৃতীয় অধ্যায়ে ব্যবহার করা হয়েছে বিজয় ফন্ট। যেখানে বানান ভুলের আধিক্য দেখা গেছে। চতুর্থ অধ্যায়ের খেলাধুলাকেন্দ্রিক উৎসবের বর্ণনা শুরু হয়েছে বিজয় ফন্ট দিয়ে হলেও কিছু লেখা ইউনিকোড আবার কিছু লেখা বিজয় দিয়ে। নৌকাবাইচের বর্ণনায়ও কুম্ভিলকবৃত্তির আশ্রয় নেওয়া হয়েছে।

এশিয়াটিক সোসাইটি সূত্র জানায়, গত বছরের ১৯ ফেব্রুয়ারি প্রতিবেদন জমা দেন ঢাবির এই দুই শিক্ষক। পরবর্তীসময়ে দু’জন রিভিউয়ারের কাছে পাঠানো হলে এতে অনিয়মগুলো তুলে ধরা হয়। প্রথম রিভিউয়ার সেখানে উল্লেখ করেছেন, গবেষণা প্রতিবেদনটি মাঝারি মানের। উৎস ব্যবহারের বড় অংশ ইন্টারনেট। তিনি পুরোটা না ছাপিয়ে আংশিক ছাপানো যেতে পারে বলে অভিমত দেন। গবেষক যতটা পরিশ্রম করা দরকার তা করেননি বলে উল্লেখ করেন।

দ্বিতীয় রিভিউয়ার এটি পদ্ধতিগতভাবে দুর্বল হিসেবে চিহ্নিত করেন। বৃহত্তর ঢাকার চারটি জেলার কথা বলা হলেও গবেষণা সীমিত থেকেছে ঢাকা শহরে। তিনি লিখেছেন, পাণ্ডুলিপি অত্যন্ত অযত্ন ও অসতর্কভাবে প্রস্তুত করা হয়েছে। গবেষক কম্পিউটার প্রিন্ট নিজে পাঠ করার মতো দায়িত্ব পালনের প্রয়োজন বোধ করেননি। ভাষাগত, বানানগত অসংখ্য ভুলভ্রান্তি রয়ে গেছে।

পরবর্তীসময়ে এশিয়াটিক সোসাইটির রিসার্চ অ্যান্ড সেমিনার কমিটি গবেষণা প্রবন্ধটি নিয়ে চার ক্যাটাগরিতে তাদের ভুলগুলো তুলে ধরে। এতে বলা হয়, পুরো প্রবন্ধটি বানান ভুলে পরিপূর্ণ। প্রবন্ধের টপ শিটে চূড়ান্ত বানান ভুল। এমনকী গবেষকদের একজন নিজের নামের বানানও ভুল করেছেন। পুরো প্রবন্ধজুড়ে ২৫০টি বানান ভুল এবং অসম্পূর্ণ বাক্যে পরিপূর্ণ। এছাড়া গবেষণা পদ্ধতিতে বিভিন্ন জনের সাক্ষাৎকারের কথা বলা হলেও এ সংক্রান্ত কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

কমিটি চারটি সুপারিশ দেয়। প্রথমত, গবেষণা চুক্তি বাতিল এবং প্রজেক্টের যে অর্থ নিয়েছেন তা দুই সপ্তাহের মধ্যে এশিয়াটিক সোসাইটির অ্যাকাউন্টে ফেরত দেওয়া, দুই. গবেষককে এশিয়াটিক সোসাইটির গবেষণা ও প্রকাশনা সংক্রান্ত কাজে তালিকাভুক্তি, চৌর্যবৃত্তির বিষয়টি অবগত করে ঢাবি উপাচার্য, উপ-উপাচার্য ও ডিনকে চিঠি দেওয়া এবং এশিয়াটিক সোসাইটির তদন্ত কমিটি গঠন।

অপরদিকে ২৩ নভেম্বর ফেলোশিপের অর্থ দুই সপ্তাহের মধ্যে ফেরত দিতে দুই শিক্ষককে চিঠি দিয়েছেন এশিয়াটিক সোসাইটির সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক ড. সাব্বির আহমেদ। এ বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলানিউজের কাছে ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করেন। তিনি বলেন, গবেষণায় চৌর্যবৃত্তি করায় তাদের প্রজেক্টটি বাতিল করা হয়েছে।

অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাবির নৃবিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. জোবায়দা নাসরীন বাংলানিউজকে বলেন, আমরা ভুলবশত খসড়া কপি জমা দিয়ে অন্যায় করে ফেলেছি। আমরা গবেষণার অর্থ ফেরত দিয়েছি। ক্ষমা চেয়েছি। এটার পক্ষে সাফাই গাওয়ার কিছু নেই।

‘তবে বিষয়টি ডিসেম্বরে শেষ হয়ে গিয়েছিল। অপ্রকাশিত গবেষণা প্রতিবেদনে প্লেজারিজম ধরার সুযোগ নেই। যতক্ষণ প্রকাশিত হয়নি ততক্ষণ সংশোধনের সুযোগ আছে। রিভিউয়াররা কোথাও প্লেজারিজম কোথাও উল্লেখ করেনি। পরবর্তী রিসার্চ অ্যান্ড সেমিনার কমিটি কী করেছে তা আমরা জানি না। ’

এশিয়াটিক সোসাইটিতে দু’টি পক্ষের দ্বন্দ্বের কারণে নতুন করে বিষয়টি সামনে আনা হচ্ছে বলে তিনি ধারণা করছেন।

ইতিহাস বিভাগের অধ্যাপক ঈশানী চক্রবর্তী বাংলানিউজকে বলেন, কালো তালিকাভুক্তির বিষয়ে কোনো কিছু জানি না। রিসার্চ ও সেমিনার কমিটির মেম্বার হিসেবে অভ্যন্তরীণ বিষয়ে বাইরে বলার সুযোগ নেই।

বাংলাপিড়িয়া থেকে হুবহু তুলে ধরার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, এটা আমরা খসড়া করেছিলাম। সেখানে পরিবর্ধন, পরিমার্জন করার সুযোগ আছে। যেমনটি পিএইচডি থিসিসেও সুযোগ থাকে।

এর আগেও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একাধিক শিক্ষক গবেষণায় চৌর্যবৃত্তির জন্য অভিযুক্ত হয়েছেন।