ঢাকা, সোমবার, ২০শে এপ্রিল, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ৭ই বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ট্রাম্পের হুমকিতে আদালত পর্যন্ত গড়াতে পারে ভোটের ফল

যুক্তরাষ্ট্রে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের প্রাথমিক ফল নির্বাচনের রাতেই সাধারণত জানা যায়। তবে এবার পরিস্থিতি ভিন্ন হতে পারে। কারণ করোনাভাইরাস মহামারির কারণে প্রচুর ভোট ডাকযোগে পড়েছে। এসব ভোট গণনায় অনেক সময় লাগে। ভোটের পর পরাজিত পক্ষ ফলাফল মেনে নিচ্ছে না এমন ঘটনা শুধু তৃতীয় বিশ্বের দেশেই ঘটতে পারে বলে মনে করা হয়।

তবে ট্রাম্প আমেরিকার প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর সেখানে এমন অনেক কিছুই ঘটে গেছে, যা দেশটির ইতিহাসে প্রায় নজিরবিহীন। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এরইমধ্যে বলেছেন, তিনি জয়ী না হলে ফল নাও মেনে নিতে পারেন। প্রয়োজনে আদালতে যাওয়ারও হুমকি দিয়েছেন তিনি। আগেই নির্বাচনে কারচুপির আশঙ্কাও করেছেন তিনি।

প্রতিবার নির্বাচনের রাতে বিভিন্ন সংস্থা আংশিক ফলাফলের ভিত্তিতে প্রেসিডেন্ট পদে জয়ী প্রার্থীর কথা জানায়। কারণ পার্থক্যটা এমন থাকে যে সব ভোট গণনার পরও আংশিক ফলে পরাজিত প্রার্থীর আর জয়ের সম্ভাবনা থাকে না। নির্বাচনের পুরো ফল জানতে কয়েক দিন বা সপ্তাহও লাগে। এবার সেই সময়টা আরো বাড়বে। গত শুক্রবার টুইটার বার্তায় প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বলেছেন, ৩ নভেম্বরই ভোট গণনা শেষ করতে হবে। তবে নির্বাচন পর্যবেক্ষকেরা বলছেন, বাস্তবে এটা সম্ভব নয়। তাই একটা গোলমালের আশঙ্কা করা হচ্ছে।

ভোটের রাতেই সব ভোট গণনা শেষ করা যায় না—যুক্তরাষ্ট্রে এটা স্বাভাবিক ঘটনা। তবে এবার এই গণনা শেষ হতে আরো অনেক বেশি সময় লাগতে পারে। এর সঙ্গে যুক্ত হতে পারে আইনগত বিরোধ। সে রকম কিছু হলে অনিশ্চয়তা আরো বৃদ্ধি পাবে এবং শেষ পর্যন্ত তাতে আদালতেরও ভূমিকা থাকতে পারে। ২০০০ সালে জর্জ ডব্লিউ বুশ ও আল গোরের ক্ষেত্রেও তা হয়েছিল।

শেষ পর্যন্ত আল গোর অসন্তুষ্ট হলেও আদালতের রায় মেনে নিয়েছিলেন। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ইতিমধ্যে হুমকি দিয়েছেন, তিনি প্রয়োজনে সুপ্রিম কোর্টে যাবেন। শুক্রবার টুইটার বার্তায় ট্রাম্প বলেছেন, বাইডেনের হাস্যকর জয় ঠেকাতে সুপ্রিক কোর্টে যাব। কারণ তিনি জিতলে সুপ্রিম কোর্টকে কট্টর বামপন্থী বিচারপতি দিয়ে পূর্ণ করে দেবেন। সেটা হতে দেব না। তিনি অভিযোগ করেছেন, বাইডেন এসব বামপন্থিকে নিয়োগ দিয়ে ফলাফল নিজের পক্ষে আনার চেষ্টা করবেন।

তবে সাম্প্রতিক চিত্রে দেখা যাচ্ছে, সুপ্রিম কোর্টে গেলে ট্রাম্পের পক্ষে রায় যাওয়ার সম্ভাবনা দেখছেন অনেকে। কারণ সর্বোচ্চ আদালতে এখন ৯ জন বিচারপতির ছয় জনই রক্ষণশীল তথা রিপাবলিকানপন্থি। ট্রাম্পই তার আমলে তিন জন নিয়োগ দিয়েছেন। সম্প্রতি সর্বোচ্চ আদালতে নিয়োগ পেয়েছেন ট্রাম্প মনোনীত বিচারপতি অ্যামি কোনি ব্যারেট।

জর্জ ওয়াশিংটন ইউনিভার্সিটির সাংবিধানিক আইনের অধ্যাপক জনাথন টার্লির মতে, ফলাফলের বিষয়টি কেবল প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ওপর নির্ভর করে না। তিনি হারলে তাকে সন্তুষ্ট করতে হবে এমন নিয়ম নেই। দায়িত্ব গ্রহণের দিন নতুন প্রেসিডেন্ট থাকবেন সিক্রেট সার্ভিসের অধীনে। উত্তরসূরির শপথ অনুষ্ঠানে ট্রাম্প অতিথি হিসেবে অংশ নেবেন।

তিনি থাকলে অস্বাগত অতিথি হিসেবেই থাকবেন। আর দায়িত্ব ছাড়তে অস্বীকৃতি জানালে তিনি হবেন গ্রেফতারকৃত অতিথি। আবার ট্রাম্পের প্রতিপক্ষ বাইডেন বলেছেন, পরাজিত হয়ে হোয়াইট হাউজ ত্যাগ না করলে ট্রাম্পকে তাড়াতে সামরিক বাহিনী ডাকা হতে পারে। অধ্যাপক জনাথন টার্লি বলেন, যে কোনো প্রার্থীর প্রচারণা টিম ফলাফলকে চ্যালেঞ্জ করতে পারে।

৪৩টি অঙ্গরাজ্যে ফলাফল পুনর্গণনার অনুমতি আছে। তবে এদের মধ্যে কিছু রাজ্যে আবার ভোটের ব্যবধানটা দেখা হয়। ফেডারেল নির্বাচন কমিশনারের তথ্যানুসারে, একটি রাজ্য ৮ ডিসেম্বর পর্যন্ত ফলাফল জমা দিতে পারে। ১৪ ডিসেম্বর রাজ্যের ইলেকটররা একত্র হন এবং তাদের ভোট দেন। ৬ জানুয়ারি কংগ্রেস তাদের ভোটদানকে বৈধতা দেয়।

কিছু কিছু রাজ্য যেমন ফ্লোরিডা ও অ্যারিজোনায় পোস্টাল ভোটের গণনা শুরু হয় ৩ নভেম্বরের ভোটের আগে। কিন্তু উইসকনসিন ও পেনসিলভানিয়ায় ৩ নভেম্বরের আগে সেগুলো স্পর্শ করা হয় না। তাই সেখান থেকে ভোটের ফলাফল দেরিতে আসবে। আরো কিছু জটিলতা আছে। পোস্টাল ভোট দেওয়ার সময়সীমা একেক রাজ্যে একেক রকমের। কিছু রাজ্য যেমন জর্জিয়ায় ৩ নভেম্বর পর্যন্ত যেসব ভোট কর্তৃপক্ষের হাতে এসে পৌঁছাবে, সেগুলো গণনা করা হবে। কিন্তু অন্যান্য রাজ্য যেমন ওহাইওতে ৩ তারিখে ভোট দিলেও (অর্থাত্, খামের মধ্যে ৩ নভেম্বর সিল থাকতে হবে) সেসব ভোট গণনা করা হবে।

এবার কিছু কিছু রাজ্যের সম্পূর্ণ ফলাফল পেতে কয়েক সপ্তাহ লেগে যাবে। ফলে আমেরিকার পরবর্তী প্রেসিডেন্টের নাম কখন আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করা হবে, সেটা আগে থেকে ধারণা করা কঠিন। আগের নির্বাচনগুলোতে এরকম হয়নি। ২০০৮ সালে ফলাফল পাওয়া গেছে পূর্বনির্ধারিত সময়ে। ২০১২ সালের ফল পাওয়া গেছে নির্ধারিত সময়ের মাত্র ১৫ মিনিট পর। ২০১৬ সালে আরো একটু দেরি হয়েছিল।

পেনসিলভানিয়ায় জয়ী হওয়ার পরই নিশ্চিত হওয়া গিয়েছিল যে হিলারি ক্লিনটনকে হারিয়ে পরবর্তী প্রেসিডেন্ট হচ্ছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। ৩ নভেম্বর যদি পরিষ্কার না হয় যে কে যুক্তরাষ্ট্রের পরবর্তী প্রেসিডেন্ট হচ্ছেন, তাহলে ভোট গণনা শেষ হতে আরো কয়েক দিন এমনকি কয়েক সপ্তাহও অপেক্ষা করতে হবে।

ওহাইও স্টেট ইউনিভার্সিটির সাংবিধানিক আইনের অধ্যাপক এডওয়ার্ড ফোলিও ১৮৭৬ সালের উদাহরণ দিয়ে বলেন, ঐ বছর শপথ গ্রহণের ৪৮ ঘণ্টা আগেও জয়-পরাজয়ের সিদ্ধান্ত আসেনি। কারণ রুথারফোর্ড বি হেইজ ও স্যামুয়েল টিলডেনের কেউই সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাননি। তিনটি রাজ্যের ভোটে সন্দেহ ছিল। ডেমোক্র্যাট নিয়ন্ত্রিত প্রতিনিধি পরিষদ এবং রিপাবলিকান নিয়ন্ত্রিত সিনেটের কেউই সিদ্ধান্তে আসতে পারছিলেন না। এরপর কংগ্রেসে একটি কমিশন গঠিত হয়। এর সদস্য ছিলেন প্রতিনিধি পরিষদ, সিনেট ও বিচারপতিদের পাঁচ জন করে। কমিশন শেষ পর্যন্ত হেইজকে বিজয়ী ঘোষণা করে।

আইন বিশেষজ্ঞ ও ম্যাসাচুসেটসের অ্যামহার্স্ট কলেজের অধ্যাপক লরেন্স ডগলাসের মতে, এক দেশে তিন প্রেসিডেন্ট হতে পারেন। সংবিধান অনুযায়ী প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে কে জিতেছেন তা স্পষ্ট না হলে কংগ্রেসের স্পিকার ভারপ্রাপ্ত পেসিডেন্ট হবেন। প্রধান বিচারপতি হয়তো ন্যান্সি পেলোসিকে শপথ গ্রহণ করাবেন। আবার আরেক বিচারপতি ক্ল্যারেন্স টমাস শপথ গ্রহণ করাবেন ট্রাম্পকে।

এমনও হতে পারে যে কেউই শপথ নিলেন না এবং ট্রাম্প, বাইডেন ও পেলোসি সবাই প্রেসিডেন্টের অধিকার দাবি করতে পারেন। ডগলাস লিখেছেন, এর মধ্যে ট্রাম্প হয়তো এমন সব টুইট করবেন, যা সহিংসতা উসকে দিতে পারে। মনে রাখতে হবে, এদেশে প্রচুর বন্দুক আছে এবং এর অধিকাংশই ট্রাম্পের সবচেয়ে উগ্র সমর্থকদের হাতে। ইতিমধ্যে পুলিশও সহিংসতা মোকাবিলায় প্রস্তুতি নিয়েছে।